সহজিয়া সাধনার যে ধারাটি আজও আমাদের চোখের সামনে বহমান তা হলো বাউল বা উদাসী। এর মধ্যেও একাধিক উপধারা আছে যেমন আউল, দরবেশ, বাউলিয়া ইত্যাদি। গানগুলির বিশেষত্ব হলো সহজ কথায় হেঁয়ালি করে সাধনতত্ত্ব প্রকাশ। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে গানের কথা সহজ ভাষায়, কথ্য ভাষায় গায়কের একতারার সাথে, গলার সুরের সাথে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাই সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন সেই গানে উঠে আসে স্বাভাবিক ভাবেই আর সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। পালাগানের মত এও লোকশিক্ষার একটা উপায়।
সচরাচর আমরা দেখেছি এই ধারায় সুফীবাদ , সহজিয়া ইসলাম ও হিন্দুধর্মের প্রকাশ। কিন্তু যদি আমরা হাজার বছর পিছিয়ে এরূপ আরেকটি ধারার সন্ধান করি ?
আমাদের বঙ্গদেশে মুসলমান শাসনের অব্যবহিত পূর্বে এরূপ একটি ধারা তৈরী হয়েছিল- যা কিনা পূর্ব ভারতের উড়িষ্যা ও বিহারেও বিস্তৃত ছিল। এই ধারাটি হলো বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা। এই সাধনার গাথা এখন বিস্মৃত , কিন্তু রয়ে গেছে আজও তার চিহ্ন। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই ধারার গীতি কোষের মধ্যে আদি বাংলাভাষার রূপ খুঁজে দেখিয়ে আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন। আজ আমাদের আনন্দের দিন , রবীন্দ্রনাথ বিরচিত জাতীয় সঙ্গীত জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করেছে বলে সংবাদ এসেছে , বাংলা ভাষার এই প্রোজ্জ্বল মুহূর্তে কেন আমরা সেই চর্যাগীতিকে স্মরণ করব না ?
বস্তুত সহজিয়া গাথার মত চর্যাপদ সাধনতত্ত্বের প্রহেলিকা প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। আবার অবধারিত ভাবেই এতে উঠে এসেছে তত্কালীন সমাজজীবনের অভাব অভিযোগের দৈনন্দিন বার্তা। পদকর্তারা অনেকেই উচ্চ মার্গের পন্ডিত সাধক , গুরু গম্ভীর সংস্কৃত গ্রন্থও রচনা করেছেন - কিন্তু সক্রিয় চেষ্টা হয়ত করছিলেন সহজিয়া সাধনাকে গুরত্ত্ব দেওয়ার। অনেকেই হীনযান বা মহাযান বা বজ্রযান বৌদ্ধ সাধক ছিলেন - কেউ আরাধনা করতেন দেবী প্রজ্নাপারমিতা কেউ বা মহামায়া। শাস্ত্রী মহাশয় ৩৩ জন পদকর্তার নাম করেছেন। পদগুলি বর্তমান বাউলগানের মতই কথাবিশিষ্ট। কামলি পাদ লিখেছেন "সোনে ভরিতী করুণা নাবী /রূপা থই মহিকে ঠাবী /বাহতু কামলি গঅন উবেসে /গেলী জাম বহু উই কইসে /খুন্টী উপারী মেলিনি কাচ্ছি / বাহতু কামলি সদগুরু পুচ্ছি।
পদগুলির মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে সাধনার ইঙ্গিত যার বাহ্য অর্থ অন্য। ভুসুকুপাদের একটি পরিচিত পদ উল্লেখ করা যায় " আপনা মাংসে হরিণা বৈরী / খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরি /...হরিণী বলঅ সুন হরিণা তো / এ বন ছাড়ি হোহু ভান্তো / তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দিসঅ /ভুসুকু ভণই মূঢা হিঅহি ন পইসই। অর্থাৎ নিজের মাংসের জন্য হরিণ নিজেই নিজের শত্রু আর শিকারী ভুসুকু তাকে ক্ষণমাত্র চোখের আড়াল করে না। হরিণী যখন হরিণকে ডেকে বন ছেড়ে পালাতে বলল , তার চপল গতিতে হরিণের চরণ আর দৃশ্যমান হলো না। পদকর্তা জানালেন মূর্খের হৃদয়ঙ্গম হবে না এই পদের মর্ম। এরকম আরেকটি পদ আছে "কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল / চঞ্চল চীএ পইঠো কাল। " এই পদের সঙ্গে মিল আছে লালন ফকিরের একটি দেহতত্ত্বের গানের অংশের -" আট কুঠরী নয় দরজা আঁটা / মধ্যে মধ্যে ঝলক কাটা / তার ওপরে সদর কোঠা ..". এরকম দৃষ্টান্ত অনেক দেয়া যায়।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রভূত পরিশ্রম করে চর্যাগীতি সংগ্রহ করে তার ব্যাখ্যা ও টীকা করেছেন। পদকর্তাদের পরিচয় বের করেছেন। বাংলাভাষার চিহ্নগুলি সেখানে দেখিয়েছেন। ভাষার দিক থেকে পদগুলি পূর্ব ভারতীয় অনেকগুলি ভাষার লক্ষ্মণ বিশিষ্ট। এগুলিতে বাংলা ছাড়াও হিন্দী , বিদ্যাপতির ব্রজবুলি ও মৈথিলী ও উড়িয়া ভাষার লক্ষ্মণ আছে। শাস্ত্রী মহাশয় এই ভাষার নাম দিয়েছিলেন সন্ধ্যা ভাষা।আলো আঁধারীর মত রহস্যময় ভাবার্থ , আবার বর্তমানকালে খানিক বোঝা যায় খানিক বোঝা যায় না , অতীতের বার্তাবহ কোন সঙ্কেত নির্দেশ করছে কৌতুহল জাগে তাই এই নামকরণ। পদকর্তারা অনেকেই বাঙালী নন। চলতি কথ্য ভাষায় পদগুলি রচিত সহজিয়া ধারার লক্ষ্যে।
সেইজন্যই হয়ত সহজ দোহায় এগুলি রচিত। কাব্যসুলভ ছন্দ অলংকার আর উপমার বাহুল্য এইগুলিতে প্রায় নেই বললেই চলে - আছে লোকসাহিত্যের সুর। কিন্তু তার মধ্যেও কোথাও কোথাও দেখা যায় সুন্দর বর্ণনা -"উঁচা উঁচা পাবত তহি বসই সবরী বালী / মোরং গী পীচ্ছ পরহিন সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী। " উচ্চ পর্বতে পর্বতে সবর বালিকার বাস , তার অলংকার হলো মোরগের পুচ্ছ আর গলায় গুন্জা ফুলের মালা। আধুনিক কবিতার মত এই বর্ণনা যথেষ্ট মনোগ্রাহী। সহজিয়া সাধনা সবর জাতীয়কেও আপন করে নিয়েছে - মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে চেয়েছে। ভাষার মধ্যে তখন বানান আর ব্যাকরণের নিগড় তৈরী হয়নি,হয়ত সেইজন্যই এত সহজে সহজিয়াদের মধ্যে স্বচ্ছন্দভাবে মিশে যাবার পথ পরিষ্কার ছিল।
সমাজ চিত্রণে তাই চর্যাগীতি এত আলোচিত। দৈনন্দিন জীবনের অভাব অভিযোগ একটা পদে পুরোপুরি লেখা আছে " টালত মোর ঘর নাহি পড়িবেশী/হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী/বেন্গ সংসার বডহিল যাঅ /দুহিল দুধু কি বেন্টে যামাঅ। .. ইত্যাদি। সমাজ জীবনের দর্পণ স্বরূপ চর্যাপদের আলোচনা এখন এর বেশী আবশ্যক বলে মনে হয় না।
বাউল উদাসী আর এই পদকর্তাদের মধ্যে তফাত্ হলো এই যে পদকর্তারা অপেক্ষাকৃত পণ্ডিত এবং শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন। তাই ভাষা প্রয়োগ আর কাব্যপ্রতিভাতে এঁরা বাউল ফকিরদের থেকে উন্নত। চর্যাগীতির রচনাকালে শৃঙ্খলিত ব্যাকরণ তৈরী হয়নি তাই বানান এবং কারক বিভক্তির প্রয়োগের কোনো শৃঙ্খলা দেখা যায় না। শুধু যেন প্রকাশ করার জন্যই গুরুশিষ্য পরম্পরায় রচনা সম্পন্ন হয়েছে - বাউলগান গুলিও তদনুরূপ। চর্যাগীতি যদিও সহজিয়া মতের প্রকাশ তবুও এর বিস্তার জনমানসে কতদূর হয়েছিল আর তা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে - পুঁথিগুলি তো গুপ্ত স্থান থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। অপরদিকে বাউলগান পুঁথিগত একদম নয় - লোকগীতিরূপে প্রচলিত , এর সংকলন বর্তমানে পুরোমাত্রায় চলছে। বাংলাদেশে লালন আকাদেমির অবদান অনস্বীকার্য। বাউলগান উদারপন্থী ইসলাম আর হিন্দু ভক্তিবাদের একটি মিশ্র ধারা বহন করে অপরদিকে চর্যাগীতি শুধু বৌদ্ধ ধর্মের সাধনতত্ত্ব নিয়েই রচিত - হিন্দু ধারার সংস্রব খুব বেশি দেখা যায় না। বাউলগানের যে বহুল প্রভাব আমরা বাংলা সাহিত্যে দেখতে পাই সেরকমটি কিন্তু চর্যাপদের ক্ষেত্রে ঘটেনি , ওগুলি নেপাল আর তিব্বতের বাইরে বেরিয়ে এসে প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে অধুনালুপ্ত।
বৌদ্ধ সাধনার যে ভিন্ন ভিন্ন মত , পদকর্তারা তার প্রকাশ নিজ নিজ ভঙ্গীতে করে গেছেন চর্যাগীতিতে। এগুলি সাধনার উপদেশ , আবার বাহ্যিক কাব্য সৌন্দর্য মণ্ডিত। গুরুশিষ্য পরম্পরায় এগুলি সংরক্ষিত হত ও সুব্যবহৃত হত। সহজিয়া সাধনার অঙ্গ হিসাবে এগুলির সাফল্যের মূল্যায়ন এবং এগুলি তত্কালীন জনমানস কতখানি আন্দোলিত করেছিল তা নিয়ে গবেষণার প্রতি কেউ উত্সাহিত হলে ভালো লাগবে।