সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৪

পাখী পড়া

গাঁজা খেকো হাঁড়িচাঁচা চোখ দুটো লাল,
লাফিয়ে লাফিয়ে ফেরে ডাল থেকে ডাল।
খ্যাঁচ খ্যাঁচ ছাতারেরা ব্যস্ত বড়ই,
চিড়িক চিড়িক ওড়ে হাল্কা চড়ুই।
বাতাসীরা ডাক দেয় এখানে ওখানে,
রোদ পড়ে আলোছায়া গেরস্ত বাগানে।
কোকিলের কুহুতান মাতায় হাওয়া,
বসন্ত এসে চলে গেল ফের -
হলো না তো গান গাওয়া।


শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪

ক্ষণিকের পথসঙ্গী

অফিস গিয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই খবর পেলুম।  মনটা ভারী হয়ে গেল।  সুভাষিনী মহাপাত্র নামে আমার জনৈকা সহকর্মিনী আগের রাতে ঢেন্কানল থেকে ফেরার পথে  দুর্ঘটনায় মারা গেছে।  দেশে বাড়ি গিয়েছিল, ভুবনেশ্বর ফেরার পথে দুর্ঘটনা।
ঘটনা দুঃখ জনক সন্দেহ নেই , চুপচাপ বসে রইলুম শুনে।  কাজকর্ম কিছুক্ষণ মাথায় উঠলো। বসে বসে কত কথা ভাবতে লাগলুম।

চার মাস আগের কথা।  বন্ধু অনাদির পিতৃবিয়োগের সংবাদ এলো। বারুনীর কৃপায় ইহলোক থেকে অকস্মাৎ তিনি অকাল মুক্তি পেয়েছেন , কাউকে সেবা- চিকিত্সার কোনো সুযোগ দেন নি।  অনাদির দেশ ঢেন্কানল।  আমার দপ্তরেই কাজ করে।  অনাদিকে সংবাদমাত্র  সে রাতে ঢেন্কানল রওনা হতে হবে , তার সাথে আসার জন্য আমাকে ফোনে দেহাতী উড়িয়া ভাষায় অনাদির মা কত কী বলেছিলেন আর এই শোক কতভাবে প্রকাশ করেছিলেন তা আজ আমার আর পুরোপুরি মনে নেই কিন্তু বিশেষ করে বলেছিলেন এই বেদনার ক্ষণে আমার সঙ্গ ও প্রবোধ অনাদির কত আবশ্যক এবং আমি যেন যাত্রাপথে তাকে একা না ছেড়ে দিই - ইত্যাদি।  অতএব আমিও অনাদির সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সৌজন্য বা বন্ধুত্ব যে খাতিরেই হোক , রাত আটটায় বসে পড়লুম বাসে।

সে কী রাস্তা ! শহর ছাড়াতেই চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল।  রাস্তার দু ধারে মাঠ।  ঢেন্কানল যতই এগিয়ে আসে ততই অন্ধকার বাড়ে। আলোর কোনো বিন্দু চোখে পড়ে না , দু হাত দূর অবধি ঠিকঠাক ঠাহর হয় না। কেউ মেরে আধমরা করে ফেলে রেখে গেলে ও টের পাবার উপায় নেই।  মাঝে মাঝে আবার জঙ্গল।  রাস্তা আর শেষ হয় না , গাড়ি চলছে তো চলছেই।  গাড়ির মধ্যে গ্রামবাসী চাষা , চাকুরে , ছেলে বুড়ো  মিস্ত্রী মজুর রয়েছে।  একটি স্ত্রীলোক আর তার কোলের বাচ্ছা পাল্লা দিয়ে জানলার বাইরে বমি করতে করতে চলল।  অন্ধকার রাস্তায় ডাকাত বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে আমি চললাম , বাকীরা দেখলাম বেশ নিশ্চিন্ত।

সব কষ্টের ই শেষ আছে।  রাত দুটোয় বাস থেকে নামলাম ঢেন্কানল।  অনাদির বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল।  বাড়ি পৌছলাম।মাসীমা আপ্লুত হয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরে কত কী বলতে লাগলেন কিছুই বুঝলাম না।  বাড়িতে লোক সমাগম কম হয় নি।

শবযাত্রায় আতসবাজীর সদ্ব্যবহার করতে করতে আর মাঝে মাঝে হরিনামে চারদিক চমকে দিয়ে আমরা এগুতে লাগলাম। ভোর রাতে বাজির আওয়াজে আশে পাশের গাছের হনুমানগুলো ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে ডালে ডালে দুপদাপ  লাফালাফি লাগালো।  অদূরে শ্মশান পৌছে গেলাম।  গেটের দুপাশে দুটো বড় শিমুল গাছ অভ্যর্থনা করছে।  আমরা সেখানে প্রবেশ করলাম।

দাহ করার সময়টা বসে বসে সেদিন কত কথা ভাবছিলাম মনে নেই, একটা ডাক শুনে চাইলাম সেদিক।  একটি মেয়ে ডাকছে। ' আমি আপনার অফিসএ কাজ করি , এরা আমাদের গ্রামের পুরনো লোক , তাই এসেছি। ' আমি হাসলাম।  মেয়েটা পাশে বসলো।  ' আপনি বুঝি প্রথম এলেন এখানে ?' আমি মাথা নাড়লাম। আরো নানা কথা হতে লাগলো , সব আমার মনে নেই।

বছর ছয়েক আগে এক প্রিয়জনের মৃত্যুতে শ্মশান যাত্রী হয়েছিলাম।  কলকাতার নিমতলা শ্মশানে কতঘন্টা অপেক্ষা করার পর আমাদের পালা এলো - তিন চার ঘন্টা হবে।  প্রচুর মৃতদেহ আর তাদের অনুগামী শত শত নানাবিধ লোক , ডোম , পূজা , অন্তিম সংস্কার, মন্ত্রপাঠ নিয়ে সেখানে এক মহা হট্টগোলের ব্যাপার।  জায়গা কম , অনেক পরলোকগত বা পরলোকগতা খাটিয়া আরোহণ করে এবং প্রিয়জনদের স্কন্ধে আরোহণ করে রাস্তার ওপরেই প্রতীক্ষা করছিলেন।  এর মধ্যে কিছু চীন জাপান দেশীয় মঙ্গোল চেহারার পর্যটক হট্টগোল দেখে চলে এসেছে  ক্যামেরা নিয়ে ব্যাপার দেখতে।  ঢুকে তারা তো থ।  আমি তামাশা করে তাদের দিকে চেয়ে বেশ মজা পেয়েছিলাম।  সেই গল্প মেয়েটিকে বললাম। মেয়েটির কাছ থেকে শুনলাম এই গ্রামের শ্মশানের মাহাত্ম্যের কথা। কিভাবে হিমালয় থেকে খুব বড় তান্ত্রিক এসে দুশো বছরের পুরনো এই শ্মশানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন , তাঁর কেমন অদ্ভূত বিভূতি ক্ষমতা ছিল ইত্যাদি।  এখানে অন্তিম সংস্কার হলে স্বর্গলাভ একেবারে নিশ্চিত- জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা অবধি শতমুখে স্বীকার করেন।  আমি চিন্তা করেছিলাম স্বর্গলাভের এমন এমন সুপথ থাকতে  লোকে এমন অধম স্থানে এত কষ্ট স্বীকার করে কেনই বা বাস করে আর জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা তিনটি মূর্তি ঘিরে এমন উন্মাদনা আর প্রবীণ  বয়স পর্যন্ত মেয়েলি পুতুলখেলা কেন যে চালিয়ে যায় সেই রহস্যের কথা।

পরদিন সেই মেয়েটির সাথেই সকালে বাসে করে ভুবনেশ্বর ফিরেছিলাম। পথে একসাথে দোকানে খেলাম।  এই করে আলাপ জমল।  এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে একসাথে অফিস এ খাওয়া দাওয়া , একসাথে বাসা ফেরা চলল।  দুবার সিনেমা দেখলাম তার সাথে আর একবার গেলুম নন্দন কানন।
তারপর সে অফ্ফিসের কাজেই কদিন অন্যত্র চলে গেল আর যোগাযোগ ছিল না।  দশ বারো দিন হলো ফিরেছে সুভাষিনী , এখনো দেখা হয়নি।  এই সংবাদ পাওয়া গেল।

ভরাক্রান্ত হৃদয়ে ভাবছিলাম ঢেন্কানল যাবার সেই ভয়াবহ রাস্তাটার কথা, দুর্ঘটনা আর বিচিত্র কি ?   

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৪

কৈশোর ও চাঁদের পাহাড়

এমন বাঙালী কমই আছেন যিনি অন্তত একবার ছোটবেলায় চাঁদের পাহাড় বইটা পড়েন নি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত পরিচিত রচনা এই চাঁদের পাহাড়। তাই যখন সেই বই সিনেমা হয়ে পর্দায় উঠে আসে তখন তো একটা হৈচৈ পড়বেই। বাংলা চলচ্চিত্রে যে তথাকথিত জোয়ার এসেছে বলে রব শুনছি তাতে আরো নিশ্চয় আতিশয্য বাড়বে বই কি। সিনেমা তে animation আর প্রযুক্তির ব্যবহার করে জিনিষটা ভালো করে দেখানোর প্রচেষ্টা প্রসংশনীয়।  পরিশ্রম আর ব্যয়াধিক্য দৃশ্যে দৃশ্যে প্রকট। মূল বই এর সাথে সঙ্গতি রেখে বানানো হয়েছে যথাসম্ভব।  কিন্তু বিষয়বস্তু রচয়িতার থেকে স্বতন্ত্র হয়ে গেছে - বিষয়বস্তু বুঝতে গেলে বুঝতে হবে বিভূতিভূষণ কে। আমি এখানে চলচ্চিত্র সমালোচনা আরম্ভ করব না , আমি চিনতে  চেষ্টা করব পথের পাঁচালী র কবিকে - চাঁদের পাহাড়ের দিকে মুখ করে।

প্রতিটি মানুষের মনে যে চিরকিশোর জেগে রয় চাঁদের পাহাড় গল্পে সেই কিশোর প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। গল্পের শঙ্কর পল্লীগ্রামের অখ্যাত সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ। চাকরীর উমেদারী করতে সে চিঠি পাঠালো সুদূর আফ্রিকা। ছেলেবেলা থেকে তাকে অজানা জগৎ হাতছানি দিয়ে ডাকে, মন চায় রবিনসন ক্রুসোর মত দুঃসাহসী হতে আর বিদেশের  অভিযান কাহিনী -কিশোর কাহিনী পড়ে পড়ে মনে জন্মায় দুরন্ত কৈশোরের স্পৃহা।  এই কৈশোর ধরা আছে চাঁদের পাহাড় গল্পে -  সেই কিশোর জেগে থাকে তরুণের অন্তরে , তাই পাট কলের বাবুগিরি উপেক্ষা করে তরুণ পাড়ি জমালো আফ্রিকা। কৈশোরের সেই স্বপ্ন, যার জন্য মন্দিরে প্রার্থনা , সেই স্বপ্ন সার্থক করার মধ্যে যে পুলক তার মধ্যে জেগেছিল - সেই কৈশোরের পুলক তার তরুণ হৃদয়কে মাতিয়ে দেয় - এই গল্প সেই কৈশোরের।
পরিণত বয়সে যেদিন শ্রীকান্ত নিজের অগোছালো জীবনের স্মৃতিচারণ করতে কলম নিয়ে বসল সেদিন সে স্বীকার করলো বারবার তার স্মৃতিতে কিশোর বেলার সাথী ইন্দ্রনাথের উজ্জ্বল আবির্ভাব। সেই সব দিনগুলোর কথা শ্রীকান্ত ভুলতে পারে নি - সারা জীবন ইন্দ্রনাথের মত আরেকটা মহাপ্রাণ সে খুঁজেছে কিন্তু পায় নি। ঐরকম হবার চেষ্টা শ্রীকান্ত করেছিল- মুগ্ধ করেছিল তাকে  ইন্দ্রনাথের সাহস, একা রাতে শ্মশানে দক্ষ নৌকা চালানো -সাপখেলা শিখতে যাওয়া, করাল নিশায় মাছ চুরি এ সমস্ত রোমহর্ষক ঘটনা।  জীবনের সেই সম্পদ শ্রীকান্ত বুকে ধরে রেখে দিয়েছিল আর অভিমান করে বলেছিল তাকে না জানিয়ে কেন ইন্দ্রনাথ সহসা একদিন অন্তর্ধান করলো। এখানেও সেই সুদূরের আহ্বান।
এই আহ্বানের কোনো অভিসন্ধি নেই। শুধুমাত্র অজানাকে জানার আগ্রহ থেকেই কাজে ইস্তফা দিয়ে শঙ্কর বেরিয়ে পড়েছিল আলভারেজের সাথে। গল্পের শেষে লেখা আছে সে আবার চাঁদের পাহাড় যেতে চায়। ঠিক এই কারণেই তোপসে বারবার ফেলুদার সাথে রহস্যের সন্ধানে বেরোয় , সন্তু সঙ্গী হয় কাকাবাবুর ইস্কুল কলেজ আর পড়াশোনা ভুলে গিয়ে। অন্ধকার রাতে মন্ত্রমুগ্ধর মত শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথের  কথায় নির্জন বিপদসঙ্কুল গঙ্গাবক্ষে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য ছিল জেলেদের নৌকা থেকে মাছ চুরি। কিন্তু সেই চুরির কারণ নিছক দুষ্টুমি নয়, অন্নদাদির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো। এই নিঃস্বার্থ ছেলেমানুষী সিনেমাতে দেখানো হয়নি। শঙ্কর খনির লোভে আলভারেজের সাথে বেরোয় নি , বেড়িয়েছিল কাছ থেকে বিপদকে দেখতে। হীরে পেয়ে গেল , কিন্তু তার নির্লোভ চিত্ত তাতে আসক্ত হয় নি , হীরে নিয়ে এসেছিল একইরকম ভাবে গাঁয়ের লোকের সাহায্যের জন্য - নিজের ভাগ্য ফেরাতে চেষ্টা সে করে নি। সেইজন্যই আফ্রিকার অভিশাপ বুনিপ তাকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল, আফ্রিকার বলি শঙ্করকে হতে হয়নি। বারবার শঙ্কর বিপদের মুখ থেকে ফিরে এসেছে , এক যেন মহত্তর কোনো কর্মের উদ্দেশ্যে তাকে রক্ষা করা হয়েছে।  ঠিক যেমন কালরাত্রির দ্রংষ্ট্রা সেই রাত্রে ইন্দ্রনাথদের ক্ষুদ্র তরীকে গ্রাস করেনি , নদীবক্ষে তলিয়ে তারা যায়নি , সর্পাঘাত পাশ কাটিয়ে চলে গেছে আর জেলেরা নাগাল পায়নি।
এই ছেলেমানুষী সিনেমাতে দেখানো হয়নি। সিনেমাতে শঙ্কর যেন রবিনসন ক্রুসো , পাঠক বালক নয়। সে পরিণত দেহী যুবক , তোপসে নয় ফেলুদা। কিম্বা আবার যখের ধনের বিমল। এইখানেই তফাৎ রয়ে গেছে। সেই কৈশোরকে এখানে তুলে ধরা হয়নি। গল্পে শঙ্কর অন্যরকম।
গল্পের শঙ্কর নিজেকে জড়িয়ে নেয় আলভারেজ, আত্তিলিও গাত্তি র জীবনের সাথে। আলভারেজের প্রতি অসীম মমতায় তার মন উথলে ওঠে - আগ্নেয়গিরির নাম দিয়ে দেয় মাউন্ট আলভারেজ। একই রকম মনোভাব দেখতে পাই আমরা ফেলুদার প্রতি তোপসে আর অবশ্যই ইন্দ্রনাথের প্রতি শ্রীকান্তর। ইন্দ্রনাথের এক কথায় শ্রীকান্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।  প্রতিটি ভাগ্যবান কিশোর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে এমন ই একজন খুঁজে পায় , যার সাথে জীবন জড়িয়ে দেয়া যায়। সেই জন্যই কিশোর সাহিত্যে রবিনসন ক্রুসোর ন্যায় চরিত্রগুলি সৃষ্টি হয়ে চলেছে। রবিন হুড কিংবদন্তী হয়ে আছে সেই কোন ঐতিহাসিক কাল থেকে। নাহলে চাহিদা মেটাবে কে ?
যেখানে কৈশোরের দুরন্তপনা সেখানেই বাত্সল্য। প্রতিবন্ধী কাকাবাবু সন্তুকে উদ্ধার করতে পিছপা হন না একবারও।  অন্নদাদির কথা নতুন করে কি বলব।  চাঁদের পাহাড় গল্পে ভাগ্যান্বেষী লড়াকু কঠিন হৃদয় পর্তুগীজ কিভাবে যেন স্নেহ করতে শুরু করে শঙ্করকে , আগলে রাখে সমস্ত বিপদ থেকে।  এই স্নেহবাত্সল্য যেন কৈশোরের এই গল্পের ঋদ্ধি।  শঙ্কর ও শুধুমাত্র দলপতি হিসাবে নয় কখন যেন তাকে পিতৃ জ্ঞানে আপন ভাবতে শুরু করে - এও সেই কৈশোরের লক্ষ্মণ।
এই কৈশোর আর বাত্সল্য কোথায় খুঁজে পেলেন বিভূতিভূষণ ? অবশ্যই তাঁর নিজের জীবনে। মানুষটার মধ্যে এক কিশোর চিরজাগরুক ছিল। খুব বেশি বয়স অবধি তাঁকে কঞ্চি হাতে বেড়াতে দেখা যেত ঠিক পথের পাঁচালীর অপুর মত। অপুর মধ্যে সেই কিশোর আজও উঁকি মারে। সর্বজয়া , ইন্দির ঠাকরুন আর দূর্গার বাত্সল্য তাকে পালন করে। এই বাত্সল্যই কি কারো কারো মনে কৈশোরকে বাঁচিয়ে রাখে ? তারা কী এই কারণেই চিরকিশোর থেকে যায় ? ইছামতীর তীরে কন্চি হাতে কল্পনায় ভেসে অপুর আড়ালে বিভূতিভূষণ যে ছেলেখেলায় মেতে যেতেন , তার ই কি পূর্ণতর অভিব্যক্তি চাঁদের পাহাড় ?
কে জানে ? অপুর কল্পণার সীমাবদ্ধতা পার করেই  কী শঙ্করের স্বপ্ন পূর্তির অভিযান  বলে মনে হয় ? প্রকৃতি তপস্বী আত্মমগ্ন আধ্যাত্মিক মানুষটা কিভাবে আবার চিরকিশোর হতে পারে?
বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন বিভূতিভূষণ।  করেছেন ছেলেদের গৃহশিক্ষকতা। সকলেই দেখেছে তাঁর বাত্সল্য।  ছেলেদের গল্প করে করে পড়াতেন। বলতেন অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের কথা , আফ্রিকার কথা , কোমাডো দ্বীপের ড্রাগনের কথা।  চেনাতেন রাতের আকাশ। ছেলেদের সাথে সমবয়সী হয়ে মিশতেন , মিতে হয়ে যেতেন। প্রচুর ভ্রমণকাহিনী , অভিযান কাহিনী পড়তেন পিপাসু হয়ে।  তাঁর সেই জীবনপর্বের গল্পগুলির একটি হলো চাঁদের পাহাড় - বাকীগুলির মধ্যে আছে হীরে মানিক জ্বলে বা মরণের ডঙ্কা বাজে।  এভাবেই কৈশোর তাঁর জীবনে বাঙ্ময় ছিল। একদিকে স্নেহাশয় শিক্ষক অপরদিকে নিজেই এক বালক আবার তার সঙ্গে পরিণত মনস্ক মগ্ন  সাহিত্যিক মানুষ - একাধারে তিনি সবই হয়ে উঠেছিলেন। সাধারণ মানুষ তিনি ছিলেন না , শঙ্কর বাঙালীর ছেলে হয়ে চাকরি ছেড়ে আলভারেজের সাথে চলল পৃথিবীর রূপ দেখতে - এ কথা সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে না। যে উপলব্ধিগুলি  বারবার তিনি লিখেছেন সেগুলি সহজ হয়েও যেন অধরা থেকে যায়। চরম সত্য প্রকাশ করেন যখন হীরে মানিক জ্বলে উপন্যাসে লোভে পড়ে প্রাণবলি হয়। আত্তিলিও গাত্তি নামে যে দুঃসাহসী নাবিক যুবকের মৃতদেহ শঙ্কর আবিষ্কার করলো সে সব পেয়েও সব হারিয়ে মারা গেছে। হীরের খনির খোঁজে সে বেরিয়েছিল , পেয়ে গিয়ে নিজেকে মালিক মনে করলো কিন্তু সঙ্গীদের চক্রান্তে নিহত হলো। রত্নভান্ডার তার কপালে জোটেনি। ঐ নামের একজন বাস্তবে অভিযাত্রী ছিলেন আফ্রিকায়। তিনি অভিযানের প্রচুর বই আর ফটো প্রকাশ করেছিলেন চাঁদের পাহাড় প্রকাশের কিছুদিন আগে।সম্ভবত বিভূতিভূষণ গল্পের উপকরণ হিসাবে ওঁর বইগুলি ব্যবহার করেছেন। সেই নামটাই বিভূতিভূষণ  ব্যবহার কেন করেছেন ? শঙ্কর গল্পের গাত্তির জুতো  থেকে হীরে পেয়েছিল, শঙ্করের আড়ালে লেখক নিজে উপকরণ স্বরূপ অভিজ্ঞতার বহুমূল্য রত্ন সংগ্রহ করার ঋণ স্বীকার করলেন আর অভিযাত্রীকে সম্মান জানালেন কি না কে জানে !  অসাধারণ ভাবে রচয়িতা দেখিয়েছেন শঙ্কর পথ চিনে নেবার, ফিরে আসবার চিহ্ন হিসাবে যে নুড়ি গুলো কুড়িয়ে নিয়েছিল না বুঝে -সেগুলিই হীরে। শেষে শঙ্কর হীরের খনির সন্ধান গোপন করে গেল সংবাদপত্রের দপ্তরে , লোভের বোঝা আর সে বাড়াতে চায়নি। বিভূতিভূষণ যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছেন শঙ্করের মধ্যেই। তাই তিনি অসাধারণ মানব , তাঁর রচনা নেহাৎ একটা ছেলেভুলানো গল্প নয়। লেখকের অসামান্য অনুভূতি প্রকাশ পেয়ে যায়।  বিভূতিভূষণের জীবন ঘাঁটলে এই অসাধারণত্ব বারবার প্রকাশ হয়। তবুও অদ্ভুতভাবে এতকিছুর মধ্যেও  সেই কিশোর বারবার দেখা  দেয়  কখনো অপু কখনো শঙ্কর কখনো আর কেউ হয়ে।  কিশোর সাহিত্যের তো অভাব নেই , কিন্তু এই ব্যাপারটা বিভূতিভূষনের ক্ষেত্রে এইখানে আলাদা। আরণ্যকের সত্যচরণ দেখার আগ্রহে বালকের মত বেরিয়ে পড়ে কিন্তু দিনলিপির বর্ণনা একজন পরিণত মনস্বীর। কখনো আত্মভোলা পথিক , কখনো সরল কিশোর , কখনো শিক্ষক  আবার কখনো  প্রকৃতি তপস্বী হয়ে বিভূতিভূষণ আমাদের মাঝে ধরা দেন - রচয়িতার পরিচয় আমরা পেয়ে যাই , মানুষটা বেঁচে থাকে আমাদের মধ্যে - চিরকিশোর  আজও ঘেঁটু সোঁদালীর  গন্ধ মেখে চোখ মেলে থাকে।  তার দুই চোখ অনবরত সুর্য্যের আলোয় নতুন রঙের খোঁজ করে, চাঁদের পাহাড়ের মত হাজার হাজার গল্প তার জন্য তৈরী হবে তবু তার আশ মিটবে না।

রবিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৪

মন বাজারী

চেয়ে দেখো চারিদিকে আজ বসেছে রঙীন মেলা
ইস্তাহারের রঙে রঙ্গে ছেয়ে গেছে -
            পুরনো ধূসর বালুকাবেলা।
চোখ ধাঁধানো ঝলমলে আলোয় সাজানো সব দোকান,
মাল্টিপ্লেক্স আর তার পাশে পাশে রসনা তৃপ্তির রেস্টুরেন্ট।
প্রাণ হারিয়ে কোথা থেকে ফের ফিরে পেয়েছে সকলে যেন প্রাণ।
 ভ্রান্ত গর্বে গলা ফাটিয়ে দোকানীরা ঘোষণা করছে নিরন্তর
অভ্রান্ত নিজেদের মালের গুণগত মান।
ব্যাঙ্ক আর ইন্সুরেন্স কোম্পানির  মাইনে করা বিক্রেতারা
প্রাণপণ চেষ্টা করে বোঝাচ্ছে সবচেয়ে লাভজনক তাদের স্কিমটাই ।
তাদের সঙ্গে জুটেছে শেয়ার বাজারের দালাল।
লাভ ক্ষতির হিসাবে হিসাবে পটু হয়ে গেছে মাথা
বোধহয় হয়ে গেছে মগজ ধোলাই।
আলো আঁধারি তে দিবারাত্র লাভ ক্ষতির অঙ্ক কষছে -
অন্য কাজের সময় কই ?  অন্য ব্যাগার  কাজে মস্তিস্ক  দিচ্ছে জবাব।
অধ্যাপক মার্কামারা  কয়েকজন বলাবলি করছে
   'পয়সা তো দালালী তে। '

মনটা তো বাজারের পানে ,
কোনখানে আছে সবচেয়ে লাভজনক
স্বপ্নময় উপকরণ।
পঞ্চেন্দ্রিয় খুঁজে বেড়ায় তৃপ্তির উপকরণ -
বাজারীরা খোঁজে আকর্ষণী উদাহরণ।
অরাজক বাজারে বড় ছোট মাঝারি
হয়ে গেছে সকলের মনগুলো বাজারী।