শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪

ক্ষণিকের পথসঙ্গী

অফিস গিয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই খবর পেলুম।  মনটা ভারী হয়ে গেল।  সুভাষিনী মহাপাত্র নামে আমার জনৈকা সহকর্মিনী আগের রাতে ঢেন্কানল থেকে ফেরার পথে  দুর্ঘটনায় মারা গেছে।  দেশে বাড়ি গিয়েছিল, ভুবনেশ্বর ফেরার পথে দুর্ঘটনা।
ঘটনা দুঃখ জনক সন্দেহ নেই , চুপচাপ বসে রইলুম শুনে।  কাজকর্ম কিছুক্ষণ মাথায় উঠলো। বসে বসে কত কথা ভাবতে লাগলুম।

চার মাস আগের কথা।  বন্ধু অনাদির পিতৃবিয়োগের সংবাদ এলো। বারুনীর কৃপায় ইহলোক থেকে অকস্মাৎ তিনি অকাল মুক্তি পেয়েছেন , কাউকে সেবা- চিকিত্সার কোনো সুযোগ দেন নি।  অনাদির দেশ ঢেন্কানল।  আমার দপ্তরেই কাজ করে।  অনাদিকে সংবাদমাত্র  সে রাতে ঢেন্কানল রওনা হতে হবে , তার সাথে আসার জন্য আমাকে ফোনে দেহাতী উড়িয়া ভাষায় অনাদির মা কত কী বলেছিলেন আর এই শোক কতভাবে প্রকাশ করেছিলেন তা আজ আমার আর পুরোপুরি মনে নেই কিন্তু বিশেষ করে বলেছিলেন এই বেদনার ক্ষণে আমার সঙ্গ ও প্রবোধ অনাদির কত আবশ্যক এবং আমি যেন যাত্রাপথে তাকে একা না ছেড়ে দিই - ইত্যাদি।  অতএব আমিও অনাদির সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সৌজন্য বা বন্ধুত্ব যে খাতিরেই হোক , রাত আটটায় বসে পড়লুম বাসে।

সে কী রাস্তা ! শহর ছাড়াতেই চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল।  রাস্তার দু ধারে মাঠ।  ঢেন্কানল যতই এগিয়ে আসে ততই অন্ধকার বাড়ে। আলোর কোনো বিন্দু চোখে পড়ে না , দু হাত দূর অবধি ঠিকঠাক ঠাহর হয় না। কেউ মেরে আধমরা করে ফেলে রেখে গেলে ও টের পাবার উপায় নেই।  মাঝে মাঝে আবার জঙ্গল।  রাস্তা আর শেষ হয় না , গাড়ি চলছে তো চলছেই।  গাড়ির মধ্যে গ্রামবাসী চাষা , চাকুরে , ছেলে বুড়ো  মিস্ত্রী মজুর রয়েছে।  একটি স্ত্রীলোক আর তার কোলের বাচ্ছা পাল্লা দিয়ে জানলার বাইরে বমি করতে করতে চলল।  অন্ধকার রাস্তায় ডাকাত বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে আমি চললাম , বাকীরা দেখলাম বেশ নিশ্চিন্ত।

সব কষ্টের ই শেষ আছে।  রাত দুটোয় বাস থেকে নামলাম ঢেন্কানল।  অনাদির বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল।  বাড়ি পৌছলাম।মাসীমা আপ্লুত হয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরে কত কী বলতে লাগলেন কিছুই বুঝলাম না।  বাড়িতে লোক সমাগম কম হয় নি।

শবযাত্রায় আতসবাজীর সদ্ব্যবহার করতে করতে আর মাঝে মাঝে হরিনামে চারদিক চমকে দিয়ে আমরা এগুতে লাগলাম। ভোর রাতে বাজির আওয়াজে আশে পাশের গাছের হনুমানগুলো ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে ডালে ডালে দুপদাপ  লাফালাফি লাগালো।  অদূরে শ্মশান পৌছে গেলাম।  গেটের দুপাশে দুটো বড় শিমুল গাছ অভ্যর্থনা করছে।  আমরা সেখানে প্রবেশ করলাম।

দাহ করার সময়টা বসে বসে সেদিন কত কথা ভাবছিলাম মনে নেই, একটা ডাক শুনে চাইলাম সেদিক।  একটি মেয়ে ডাকছে। ' আমি আপনার অফিসএ কাজ করি , এরা আমাদের গ্রামের পুরনো লোক , তাই এসেছি। ' আমি হাসলাম।  মেয়েটা পাশে বসলো।  ' আপনি বুঝি প্রথম এলেন এখানে ?' আমি মাথা নাড়লাম। আরো নানা কথা হতে লাগলো , সব আমার মনে নেই।

বছর ছয়েক আগে এক প্রিয়জনের মৃত্যুতে শ্মশান যাত্রী হয়েছিলাম।  কলকাতার নিমতলা শ্মশানে কতঘন্টা অপেক্ষা করার পর আমাদের পালা এলো - তিন চার ঘন্টা হবে।  প্রচুর মৃতদেহ আর তাদের অনুগামী শত শত নানাবিধ লোক , ডোম , পূজা , অন্তিম সংস্কার, মন্ত্রপাঠ নিয়ে সেখানে এক মহা হট্টগোলের ব্যাপার।  জায়গা কম , অনেক পরলোকগত বা পরলোকগতা খাটিয়া আরোহণ করে এবং প্রিয়জনদের স্কন্ধে আরোহণ করে রাস্তার ওপরেই প্রতীক্ষা করছিলেন।  এর মধ্যে কিছু চীন জাপান দেশীয় মঙ্গোল চেহারার পর্যটক হট্টগোল দেখে চলে এসেছে  ক্যামেরা নিয়ে ব্যাপার দেখতে।  ঢুকে তারা তো থ।  আমি তামাশা করে তাদের দিকে চেয়ে বেশ মজা পেয়েছিলাম।  সেই গল্প মেয়েটিকে বললাম। মেয়েটির কাছ থেকে শুনলাম এই গ্রামের শ্মশানের মাহাত্ম্যের কথা। কিভাবে হিমালয় থেকে খুব বড় তান্ত্রিক এসে দুশো বছরের পুরনো এই শ্মশানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন , তাঁর কেমন অদ্ভূত বিভূতি ক্ষমতা ছিল ইত্যাদি।  এখানে অন্তিম সংস্কার হলে স্বর্গলাভ একেবারে নিশ্চিত- জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা অবধি শতমুখে স্বীকার করেন।  আমি চিন্তা করেছিলাম স্বর্গলাভের এমন এমন সুপথ থাকতে  লোকে এমন অধম স্থানে এত কষ্ট স্বীকার করে কেনই বা বাস করে আর জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা তিনটি মূর্তি ঘিরে এমন উন্মাদনা আর প্রবীণ  বয়স পর্যন্ত মেয়েলি পুতুলখেলা কেন যে চালিয়ে যায় সেই রহস্যের কথা।

পরদিন সেই মেয়েটির সাথেই সকালে বাসে করে ভুবনেশ্বর ফিরেছিলাম। পথে একসাথে দোকানে খেলাম।  এই করে আলাপ জমল।  এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে একসাথে অফিস এ খাওয়া দাওয়া , একসাথে বাসা ফেরা চলল।  দুবার সিনেমা দেখলাম তার সাথে আর একবার গেলুম নন্দন কানন।
তারপর সে অফ্ফিসের কাজেই কদিন অন্যত্র চলে গেল আর যোগাযোগ ছিল না।  দশ বারো দিন হলো ফিরেছে সুভাষিনী , এখনো দেখা হয়নি।  এই সংবাদ পাওয়া গেল।

ভরাক্রান্ত হৃদয়ে ভাবছিলাম ঢেন্কানল যাবার সেই ভয়াবহ রাস্তাটার কথা, দুর্ঘটনা আর বিচিত্র কি ?   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন