শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৩

বিদ্যাসুন্দর কাব্য - ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদ

ব্লগ লেখা শুরু করার দিন ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম কালিকা মঙ্গল নিয়ে লিখব, কারণ দিনটা ছিল কালীপূজা। লিখেছিলাম ভারতচন্দ্র আর রামপ্রসাদ রচিত বিদ্যাসুন্দরের কথা যা কালিকা মঙ্গলের নামান্তর।  দুই কবির কাব্যের একটা যদি আলোচনা যদি নিজে করতে পারি তাহলে নেহাত মন্দ হয় না।  অবশ্যই আমি এখন গুরু গম্ভীর তাত্ত্বিক আলোচনা করতে বসব না , আগে প্রচুর হয়ে গেছে।  অনেক পন্ডিত , বক্তা অনেক কিছু উপস্থাপন করেছেন আগে , অনেক সমালোচনা বিতন্ডা হয়ে গেছে - 'হাতী ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল ' হয়ে যাবে।

দুই কবিই সমসাময়িক এবং প্রায় সমবয়স্ক, তাই তুলনামূলক আলোচনা অবশ্যম্ভাবী ।  দুজনেরই    দুজনেরই আহ্বায়ক রাজা কৃষ্ণচন্দ্র , তিনি ও এঁদের সমবয়স্ক।  যুক্তি দেখানো হয় যে রামপ্রসাদের বিদ্যাসুন্দর পূর্বে রচিত-নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে ভারতের আগেই প্রসাদের পরিচয়। গুণগ্রাহী রাজা প্রসাদকে পারিষদ বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বৈরাগ্য মনস্ক রামপ্রসাদ রাজি হন নি।  রাজা তখন প্রসাদকে কবিরঞ্জন উপাধি দিয়ে বিদ্যাসুন্দরের আখ্যান কাব্য লিখতে বলেন আর ভূমি সহ  বৃত্তি দেন। ওই কাব্য লেখানো রাজার অনেক কালের অভীপ্সা ছিল। ভারতচন্দ্রের সাথে পরিচয় তারপর। এইবার প্রশ্ন হলো রাজা কী একই অনুরোধ ভারতকে করেছিলেন , না ভারত নিজে রাজাকে খুশী করতে অন্নদামঙ্গল এর মধ্যে কালিকা মঙ্গল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন নাকি রামপ্রসাদের কাব্য পড়ে তারপর আবার করে লিখেছিলেন, হয়ত রাজাই বলেছিলেন আবার করে লিখতে। প্রসাদের রচনা পড়ে অন্নদামঙ্গলে নতুন করে বিদ্যাসুন্দর ঢুকিয়েছিলেন কিনা তাও বলা যায় না - যদিও যুক্তি দেখানো হয় ওই পর্ব টি ছাড়া যেহেতু অষ্টমন্গলা সম্পূর্ণ হয় না তাই বিদ্যাসুন্দর গোড়া থেকেই  ভারতের অন্নদামঙ্গলে ছিল।  বিনয়ী স্বভাব প্রসাদ কখনই ভারতচন্দ্রর রচনা সমাপনের পর নিজের কাব্য রাজাকে উপহার দিতে যেতেন না বলে পন্ডিতরা যুক্তি দেন, তাই বলা হয় প্রসাদের কাব্য আগে লেখা হয়েছে , তখন প্রসাদের বয়স কম - মধ্য যৌবন বলে রচনা পড়ে অনুমান করা হয়।

এইবার দ্বিতীয় প্রশ্ন।  কী  অনুসরণ করে বিদ্যাসুন্দর লেখা হলো ? নিয়ম অনুযায়ী মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক বিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারত তো তাঁর পূর্বসূরী কবিকঙ্কন কে হুবহু অনুসরণ করেছেন - প্রসাদ ও তথৈবচ। ঊনবিংশ শতকের সাহিত্যিক পন্ডিত মহলে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম আর ভারতচন্দ্রের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা তুমুল হতো - যথা বিহিত প্রাচীন পন্থীরা ছিলেন কবিকঙ্কনের স্বপক্ষে। প্রসাদ শব সাধনার বিস্তারিত পদ্ধতি শিখিয়ে ফেলেছেন বাড়াবাড়ি করে - যা কিনা তন্ত্রমতে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ! দুজনেই অষ্ট মঙ্গলা  লিখেছেন। সেদিক থেকে কোনো সংশয় নেই। কথা হলো মূল কাহিনী নিয়ে। বিদ্যা সুন্দরের প্রণয় কাহিনী নিয়ে এর ও আগে অন্তত একজন বাঙালি কবি বাংলায় কাব্য লিখেছিলেন , নাম প্রাণরাম চক্রবর্তী। মূল কাহিনীর উপাদান খুঁজতে গিয়ে শিখে পড়ে  দেখা গেল কিংবদন্তী আছে বররুচি নামের কোনো কবি  সঙ্গস্কৃত ভাষায় আদি কাহিনী লিখেছিলেন  আর যে চৌরপন্চাশত্ শ্লোকগুলি এতে সন্নিবেশিত আছে এগুলি চৌরকবি নামে প্রসিদ্ধ জনৈক বিল্হন রচিত। এই বিল্হন বিন্ধ্যাচল সন্নিহিত কোনো দেশের লোক এবং এক রাজকন্যার প্রতি প্রনয়াসাক্ত হয়ে পরেন পড়াতে পড়াতে আজকালকার মত। শেষে রাজকন্যার বাবা রেগে গিয়ে মৃত্যুদন্ড দিলে শ্লোকগুলি হৃদয়ের কন্দর ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল। আদি কাব্যের পটভূমি সম্ভবত ছিল উজ্জয়িনী, আমাদের কবিরা সেটাকে বর্ধমানে নিয়ে এসেছেন।  বর্ধমানে প্রচলিত ঐরূপ কোনো লোককাহিনী নেই। সংস্কৃত ভাষায় অনেকেই বিদ্যাসুন্দর লিখেছেন চেনা অচেনা।  বলা হয় আমাদের কবিরা ঐরকম কোনো উত্স থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন।

অনেকেই কবিরঞ্জন বিদ্যাসুন্দরের নামই শোনেন নি। ভক্ত রামপ্রসাদের গান কবিরন্জনের কাব্যকে ম্লান করে দিয়েছে। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের অত্যধিক জনপ্রিয়তার মাঝে রামপ্রসাদের বিদ্যাসুন্দর হারিয়ে গেছে। এ কথা সত্যি যে সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম উজ্জ্বল সাহিত্যনক্ষত্র ভারতচন্দ্র বিরাট খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ভারতের বিদ্যাসুন্দর তাঁর অন্নদামঙ্গলের বহুল প্রচার আর খ্যাতির হাত ধরে এগিয়ে গেছে। বস্তুত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নিজের ইষ্টদেবী অন্নদার পালাগান কীর্তন বেশি করে আয়োজন করতেন। প্রসাদ রাজার কাছ থেকে দূরে থাকতেন, কবিরঞ্জন বিদ্যাসুন্দরের বহুল প্রচার হয়নি। উল্লেখ্য যে ভারতের বিদ্যাসুন্দর মূল অন্নদামঙ্গল কাহিনীর অন্তর্গত আরেকটি উপাখ্যান , যা কিনা ভবানন্দ মজুন্দার শোনাচ্ছেন  সেনাপতি মানসিংহ কে - দুটিই অন্নদামঙ্গল কাব্যের চরিত্র- প্রসাদের তা নয়। আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করার মত।  ভারতের প্রতিটি ভণিতা তে রাজার নাম আছে  দেবী অন্নপূর্ণা  আর নিজের নাম পরিচয় সহ  কিন্তু প্রসাদ রাজার নাম কোথাও লেখেন নি , শুধু নিজের আর দেবী কালিকার নাম লিখেছেন -আমার ইঙ্গিত নিশ্চয় স্পষ্ট। প্রসাদ রচনা করেছেন ভক্তিভরে, উচ্চ মার্গের সাধনার সংকেত প্রহেলিকা করে করে লেখা আছে কাব্যে যা কিনা বোঝা যায় না স্থূল দৃষ্টিতে, তাই কাব্য জনপ্রিয় হয়নি - হয়ত কবি নিজেই সাধনার গুপ্ত রহস্য বহুল প্রকাশে মোটেই ইচ্ছুক ছিলেন না। ছন্দ অলংকার প্রয়োগে ,শব্দচাতুরিতে ভারতের কাব্য পালাগানের  প্রকাশভঙ্গীতে আসর জমাতে অত্যন্ত অনুকূল তদুপরি সাধারণ মানুষের জীবনের উপাদান ভরপুর, আদিরসে জারিত, প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা, প্রসাদের মত স্থানে স্থানে অবোধগম্য নয়  - জনপ্রিয় হবে না কেন ?
গোপাল হালদার বলেছেন ভারতচন্দ্র মধুসূদনের পূর্বসুরী। সত্যি কথাই যে শুধু ভাষা দেখে নয় ভারতের রচনায় যে আধুনিকতার ছাপ আছে তা দেখেই তা বোঝা যায়। ভক্তিরসময় মঙ্গল কাব্য আধুনিক উপন্যাস হয়ে উঠেছে যেখানে নরনারীর প্রণয় আছে , সমাজজীবনের চিত্র আছে , রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অভিঘাত করছে - ভক্তিভাব যেন গৌণ - সেটি ই প্রধান উপজীব্য নয়।  বর্তমান বাংলা ভাষা আর ভারতচন্দ্রের ভাষার প্রচুর মিল কারণ বর্তমান চলিত বাংলা ভাষা আসলে নদীয়ার ভাষার পরিমার্জিত রূপ তাই বুঝতেও অসুবিধা হয় না এখনো , তাই দেখি উনবিংশ শতাব্দীর সর্বাধিক মুদ্রিত বাংলা পুস্তক হলো অন্নদামঙ্গল।
সুললিত প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করা আছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ যার জন্য গবেষকদের কাছেও প্রিয়। আছে ঐতিহাসিক গুরুত্ত্বপূর্ণ চরিত্র বা ব্যক্তিদের এবং স্থানের নাম। ভারতচন্দ্র যথেষ্ট পরিশীলিত।  ভক্তিরসের চেয়ে সৃষ্টি করেছেন বেশি করে কৌতুকরস আর শৃঙ্গার  রস, শব্দ এবং ছন্দ নিয়ে স্বচ্ছন্দ খেলা করেছেন - ব্যঙ্গ ও বক্রোক্তি র অবতারণা করে ক্ষুরধার লেখনীর পরিচয় দিয়েছেন।  অলংকার প্রয়োগ করার ফলে কাব্যের আকর্ষণী ক্ষমতা শতগুণ হয়েছে বাকি সাধারণ ছড়া পাঁচালীকারদের থেকে। সমাজ জীবনের যে চরিত্র বর্ণনা করেছেন আজ ও তা জীবন্ত।
রামপ্রসাদের রচনায় ভক্তিরসের প্রভাব বেশি।  আদিরস এবং কৌতুকরস ও আছে তবে ভারতের মত নয়।  নেই ক্ষুরধার লেখনীর কটাক্ষ , ঐতিহাসিক বর্ণনা।  ছন্দ  বাকী কবিদেরই মত , অলংকার যথেষ্টই আছে তবে তত মধুর নয়। এখানে ভক্তির আবেগ আর সাধনতত্ত্ব প্রাধান্য লাভ করেছে।  বোঝাই যায় যে সাধকের রচনা।  মগ্ন সাধকের ভক্তির আকুতি ফুটে উঠেছে কন্ঠে তার সাথে প্রচ্ছন্ন আছে সামান্য অহংকার- সাধকের বা বৈরাগীর অহংকার। সমাজ জীবনের বর্ণনা নেই বেশি , কিন্তু চরিত্রায়ন খুব ভালো করে করা আছে।  যা কিনা আবার ভারতচন্দ্র এড়িয়ে গেছেন। কোটালের  চোর ধরার মতলবটা ডিটেক্টিভ গল্পের মত- সারা জায়গায় সিঁদুর ফেলে রেখে দেওয়া , সুন্দর এলে পরে তার বস্ত্রে সিঁদুর লেগে যাওয়া এবং পরদিন সেই বস্ত্র ধোপার কাছে কাচতে দিলে পরে ধোপাকে পাকড়াও করে সুন্দরের গ্রেপ্তার। এস্থলে ভারতচন্দ্র অবতারণা করেছেন রসিকতা করে রক্ষীদের সখীবেশ ধারণ করে ওৎ  পাতার কথা।  বর্ধমান শহরের যে বর্ণনা প্রসাদ দিয়েছেন তা ভারতের মত অত বিস্তৃত নয়। প্রসাদ আবার শব সাধনা শিখিয়েছেন , যা আশাতীত। প্রসাদের কবিতায় হিন্দি ফার্সী শব্দের আধিক্য স্থানে স্থানে অর্থ দুরূহ করে দিয়েছে , বোঝা যায় না।

 বাংলা সাহিত্যে দুই কবিই উজ্জ্বল রত্ন হিসাবে স্থান পেয়েছেন নিঃসন্দেহ। একদিকে আলোর বিচ্ছুরণের ছটা তো অন্যদিকে তিমিরবিদারী জ্যোতি অনির্বাণ হয়ে আছে। ভারতচন্দ্রের যমক , অনুপ্রাস আর ব্যাজস্তুতি সহ ধারালো কৌতুকরস যদি পারে পালাগানের আসর মাতাতে রামপ্রসাদের ভক্তিরস সহ সাধনার গভীর ইঙ্গিত পারে উচ্চমার্গের ভক্তের অন্তরে শিহরণ জাগাতে।  দুই কবির পারস্পরিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল , দুজনের মধ্যে আলাপ আলোচনা হত কিনা বৌদ্ধিক জগৎ নিয়ে কোনো কফি হাউস জাতীয় বটতলা কিম্বা রাজার মহলে তা আজ আর জানার উপায় নেই। কবির লড়াই এর কথা আমরা সবাই শুনেছি। রামপ্রসাদের সাথে আজু গোঁসাই কবির লড়াই করেছিলেন বলে জনরব। আজকের মত আগেকার দিনের কবিরাও অন্যান্য কবিদের লেখা জোখা পড়তেন, হয়ত আলোচনাও করতেন। অনেক কবি ই অন্যান্যদের ব্যাপারে নিজেদের কাব্যে লিখেছেন , যেমন জয়দেব লিখেছেন চৌরকবির কথা , গোবর্ধন, ধোয়ীর কথা।  সমালোচনা বা রিভিউ এরকম বিস্তৃতভাবে হত কিনা জানি না। আমি উপসংহার করব এবার ওই যুগের রচনাশৈলী তে কাব্য করে , আলোচনা আর বাড়াব না। সেযুগে যদি আলোচনা করতাম তাহলে হয়ত কতকটা এইরকম লিখতাম -

কবি হৃৎ কমলাসনা                               সারদা হংসবাহনা
                         বরদানে করিলা ধী পূর্ণ।
চতুঃ শতাব্দী গতে গণ্য                         পন্ডিত পড়ুয়া করে মান্য
                        কালের কৃপায়  কালোত্তীর্ণ।।
কবি প্রসাদ শ্রী রাম                            বিতরিল মাতৃনাম
                      ঢলঢল ভক্তির আকুতি ।
সুবিখ্যাত যে  পন্ডিত                      রাজসভাতে  মন্ডিত
                      রায়গুণাকর মহামতি ।।
এক পাখি গাহি গান                        জুড়াইল ভক্তপ্রাণ
                     শিক্ষা দিল সাধনরহস্য ।
অন্যটি রসবিহঙ্গ                            জানে নাহি ছন্দভঙ্গ
                    অলংকার করিলো বশ্য ।।
একজনের গান বন্দনা                    শাণিত লেখনী অন্যজনা
                      রসে রঙ্গে ভাসে বঙ্গজনা ।
এ যুগের কালগ্রাসে                         কাব্য, ভক্তি ভাগে ত্রাসে
                     সাধুসঙ্গে পড়ে অন্যমনা ।।                                   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন