রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৩

Book Review: Story of My Life by Fakir Mohan Senapati, Translation by Jatindra K Nayak & Prodeepta Das, Vidyapuri Publications

শ্রী ফকির মোহন সেনাপতির আত্মচরিত উড়িয়া ভাষায় লেখা প্রথম আত্মজীবনী। উড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যের স্থপতিদের মধ্যে উনি অন্যতম। উড়িয়া থেকে ভাষান্তর করা বই The Story of My Life পড়ে যা বোঝা গেল বইটি খুব ই সংক্ষিপ্ত।  অনুবাদক যুগল অলমতি বিস্তারেণ পন্থা অবলম্বন করেছেন নাকি মূল রচনাটাই সংক্ষিপ্ত বলা মুশকিল কারণ আমার উড়িয়া সাহিত্য বিষয়ে অজ্ঞতা। এমনও  হতে পারে লেখকের শেষ জীবনের ভগ্নস্বাস্থ্য বইটার কলেবর বৃদ্ধি এবং অধিকতর ঋদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাস্তবিক । যাইহোক, যেকোনো আত্মজীবনীর মতই এটাও যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক কিন্তু তার চেয়েও বেশী তাত্পর্য্য হলো শুধু এটি প্রথম উড়িয়া আত্মজীবনী বা লেখকের নাম ফকির মোহন বলে নয় এটি যথেষ্ট ঐতিহাসিক।  কারণ ফকির মোহন শুধু সাক্ষীর মত ঘটনা লিখে যাননি তিনি ওড়িশার ইতিহাসের একজন রূপকার তাই তাঁর বর্ণনা ইতিহাস সমৃদ্ধ।

রচনাশৈলী ও প্রকাশভঙ্গীতে বারবার শরত্চন্দ্রর কথা মনে পড়ে  যায়। লেখকের নিজস্ব ভাবনা বা অনুভূতি বিশেষ স্থান পায় নি , কতকটা সাংবাদিক বর্ণনার মত মনে হয় পড়তে পড়তে।  লেখকের কর্ম ও কর্মজীবনের বিস্তারিত কথা লেখা যুক্তিপূর্ণ ভাবে, বিভুতিভূষণের আরণ্যক ধরণের মগ্ন অনুভূতির কোনো জায়গা নেই - কঠোর তথ্যনিষ্ঠ বাস্তব পরিস্থিতির বর্ণনা, অনেকটা অক্ষয় কুমার বড়ালের প্রবন্ধগুলোর মত - মাঝে মাঝে শুধু অল্প অল্প নিজের ইনপুট বা দৃষ্টিভঙ্গীর ছোঁয়া। আমাদের কর্মজীবনের মতই পড়তে পড়তে মাঝে একঘেয়ে লাগছিল।  এমনকি রাজার খরচের হিসেব ও লেখা আছে এক জায়গায়।
লেখকের বর্ণনায় উনবিংশ শতাব্দীর উত্কলের টুকরো টুকরো ছবি পাওয়া যায় যেগুলো পাঠক জুড়ে নিয়ে একটা পরিপূর্ণ ধারণা করতে পারেন , এটাই রচনাটার একটা interactive দিক। কিভাবে এক অনাথ বালক বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে চরম দারিদ্র্যর মধ্যে থেকে উঠে এসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলির যোগ্য হয়ে উঠেছিল, দেশের মানুষের সম্মান লাভ করেছিল নিজের নিঃস্বার্থ কর্ম এবং দেশদশের প্রতি প্রীতি দ্বারা এ হলো সেই কাহিনী। রচনায় রস সৃষ্টির কোনো পরিকল্পিত প্রয়াস দেখা না গেলেও করুণ  রস আর কৌতুক রস সমান ভাবে মিশে আছে। আছে নিজের মা বাবা ভাইদের মৃত্যুর কথা, পুত্রশোকের কথা, দুইবার পত্নীবিয়োগের কথা , পালিকা মাতৃসমা পিতামহীর প্রয়াণের শোকের কথা - কিন্তু সেগুলো অধিক নয়। তার চেয়েও বেশি আছে ১৮৬৬ সালের মারাত্মক দুর্ভিক্ষর কথা।  ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষ আজ এতদিন পরেও ওড়িশাতে কুখ্যাত। সে সময়ে তরুণ  লেখকের মনে গভীর দাগ কেটেছিল অন্নাভাব, অন্নের মূল্যবৃদ্ধি  , সর্বত্র মৃতদেহের স্তুপ, মানুষের পাতা মূল খেয়ে বা উপবাস করে প্রাণধারণ  এবং সবশেষে ত্রান শিবিরের খাদ্য খেয়ে বা ত্রান শিবির যাত্রাপথেই বহু মানুষের প্রাণত্যাগ। এছাড়া আছে দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা। কৌতুক রসের অবতারণা করেছেন লেখক সাহেবদের নিয়ে , এদেশ সম্বন্ধে তাদের অজ্ঞতা আর সীমাবদ্ধ ভাষাজ্ঞান নিয়ে ,  দেশের সামন্ত রাজাদের অযোগ্যতা আর অল্পবুদ্ধি নিয়ে , কেওন্ঝারের ভুইয়া বিদ্রোহ নিয়ে , লোকের অতি চালাকি নিয়ে, লিখেছেন ভন্ড সাধুরা রাজার আতিথ্য গ্রহণ করে রাজার অর্থেই বড়লোক হয়ে কিভাবে রাজারই ঊত্তমর্ণ হয়ে উঠত।

বস্তুত ওড়িশার ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণের অব্যবহিত পরে ফকির মোহনের জন্ম।  ওঁর লেখায় তাই আছে কিভাবে ব্রিটিশ এসে বালেশ্বর অধিগ্রহণ করে নিল, কিভাবে পৈতৃক  জমি হাতছাড়া হয়ে গেল।  দেশে অত্যধিক মৃত্যুহার ছিল, চিকিত্সা ব্যবস্থা বলে কিছুই ছিল না , ছিল কলেরা , ভেদ ইত্যাদি রোগের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব।  শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল খুব ই অপ্রতুল , কুসমস্কার আর অন্ধবিশ্বাস মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আর মানুষ হিন্দুধর্ম ছেড়ে খ্রীষ্টান হয়ে যাচ্ছিল।  লেখক নিজে স্বীকার করেছেন তিনি বন্ধু কবি রাধানাথের সঙ্গে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু তা শেষ অবধি হয়নি , পরে তিনি ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হন।  লেখাপড়া শিখতে শিখতেই ফকির মোহনকে স্কুল ছেড়ে দিতে হয় এবং শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়।  ওঁর কর্মজীবনের উত্থান পতন ও ঘটনা বাহুল্য নিয়েই বইটি ভর্তি। বিশাল কর্মজীবনে উনি প্রচুর ভ্রমণ করেছেন , বিভিন্ন সামন্ত রাজাদের দেওয়ান বা ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেছেন , ব্রিটিশ অফিসার দের সংস্পর্শে এসেছেন - সাহায্য লাভ করেছেন।  Ravenshaw সাহেবের সাথে পরিচিতি ছিল , চিনতেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরকে , কথা বলে এসেছিলেন মাদ্রাসে বাল গঙ্গাধর তিলকের সাথে  কংগ্রেস অধিবেশনে গিয়ে - দিয়েছেন মাদ্রাসএর বর্ণনা।  বারবার তাঁর লেখায় উঠে আসে সামন্ত্রতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্তিম লগ্নের অবক্ষয়ের কথা।  রাজপরিবারের উত্তরসূরীরা বেশিরভাগ ই  অযোগ্য, অনেকেই নাবালক , কেউ মদ্যাসক্ত , কেউ নিরক্ষর আবার কেউ বা ভালো।  ব্রিটিশ অফিসার দের সুপারিশে লেখক নিযুক্ত হতেন দেওয়ান বা ম্যানেজার পদে- লিখে গেছেন সেসব কথা , প্রজাদের বিদ্রোহ আর অসন্তোষের কথা , রাজাদের ঋণগ্রস্ত অবস্থার কথা , মানসিক বিষাদের কথা, ব্রিটিশ শাসকদের হস্তক্ষেপের কথা।  কেওন্ঝার এর ভূঁয়ান বিদ্রোহ দমনের আখ্যান বেশ রোমাঞ্চকর, কোনো এক রাজার পত্নীবিয়োগের পর তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করছিলেন দেওয়ান হয়ে , সে গল্প মজার।

শিক্ষাব্রত আর সাহিত্য সাধনা তাঁর জীবনের অঙ্গ ছিল।  স্কুল তৈরী করেছেন , চালাতে চেষ্টা করেছেন - সে সময়ে সে প্রচেষ্টা ছিল কঠিন।  লিখেছেন কিভাবে কত কষ্ট করে টাকা যোগাড়  করে বালেশ্বর এ প্রেস তৈরী করেছিলেন সে কাহিনী কৌতুকপ্রদ।  প্রগতিশীল হয়ে বাগানে চাষ করেছিলেন প্রথমবার ফুলকপি , টমেটো , গাজর। সবই লিখেছেন।  লিখেছেন বারবার দেশের অরাজক অবস্থার কথা , লুটপাটের  কথা - পথে ডাকাতির কথা - ঠগীদের কথা , কবি বন্ধু রাধানাথ রায়ের কথা, মধুসূদন দাসের কথা। দেশে যোগাযোগ এবং যাতায়াতের কোনরকম ব্যবস্থা ছিল না , লিখেছেন সেকথাও - নিজের খরচে কোনো এক গ্রামে কুয়ো বানিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীদের দুর্দশা দেখে; এছাড়াও পথ বানিয়েছেন , বানিয়েছেন বাজার।  সাহিত্য রচনা করে চলেছেন তার সাথে।

আমরা যারা গর্বভরে ভাষা দিবস এখন পালন করি বাঙালী হিসেবে - ভাবতে অবাক লাগে ১৫০ বছর আগে বাঙালীরাই উড়িয়া ভাষা ও সমস্কৃতি উত্খাত করতে আগ্রাসী হয়ে উঠে পড়ে  লেগেছিল। বাঙালী আর উড়িয়া দুই জাতির মধ্যে বিদ্বেষ তখন অত্যন্ত বেশী ছিল বলে লেখক বর্ণনা করেছেন।  সেমতাবস্থায় সাহিত্য সভা প্রতিষ্ঠা , পত্রিকা প্রকাশ , রচনা ,  উড়িয়া স্কুল বই চালু করা ইত্যাদি তে লেখক মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সময়ের পরিবর্তন তাঁর লেখায় ধরা পড়ে বালেশ্বর বন্দরের বন্ধ হয়ে যাওয়া , বালেশ্বরের লবণ উত্পাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদির বিবরণের মাধ্যমে।  ছোটবেলায় লেখক বন্দরের জাহাজের পাল তৈরীর কাজ তদারক করতেন পারিবারিক ব্যবসা হিসাবে।  বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে লবণ উত্পাদনের কারখানায় লেখালিখির কাজে যোগ দিয়েছিলেন।

বইটি পড়ে বোঝা যায় লেখকের একটা নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা ছিল দেশের মানুষের প্রতি যা তিনি প্রকাশ করেছেন। মাতৃভাষার প্রতি ও অকুন্ঠ অনুরাগ ছিল। দেশের মানুষের প্রতি বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বইতে , ভূমিকায় লিখেছেন উড়িয়া ভাষায় আত্মজীবনী লিখে গেলাম বন্ধুবর্গের অনুরোধে ভবিষ্যতের রচনাকারদের ভিত্তিরূপে মাত্র।  অনুবাদ কার্য সহজ সরল, বাহুল্য বর্জিত। তবে বিশেষ কোনো উল্লেখ্য কিছু নয় বলে মনে  হলো, সাধারণ।    সাহিত্যপ্রেমীদের থেকে বইটা ইতিহাস অনুসন্ধানীর ভালো লাগবে বেশি কারণ তো বেশ বোঝাই যাচ্ছে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন