অফিস এর নতুন বিল্ডিং যেখানে তৈরী হচ্ছে সেখানে যেন একটা মস্ত বড় কবর খোঁড়া। এত বড় excavation আমি আর দেখিনি। তৈরী হবে তথ্যপ্রযুক্তি ইমারত। অর্থনৈতিক বিকাশ আর বাধা মানছে না, চারিদিকে উন্নতি আর অগ্রগতির জয়জয়কার। কিন্তু কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে না ?
৩ বছর আগে যখন ভুবনেশ্বরে বদলি হয়ে এলাম তখন চন্দ্রশেখরপুর reserve ফরেস্ট এর অন্তর্গত SEZ শিল্পাঞ্চল হিসাবে চিন্হিত স্থানে আমাদের কোম্পানির একটাই বিল্ডিং ছিল। বাগান ঘেরা। শুনতাম জঙ্গল কেটে পাহাড় ফাটিয়ে তৈরী হয়েছে, আগে হাতী আসত, প্রচুর সাপ ছিল, সাপুড়ে দের ডাকা হয়েছিল, বাঘ ছিল, আদিবাসীরা ছিল, এমনি আরো কত কি। নিজের চোখে দেখিনি। তবে হা , যখন বিকেলে ঘুরতে বেরোতাম পিছনদিকটা , সেদিকটা ভারি চমত্কার লাগত। অপরাহ্নের গোধুলি আলোয় খোলা আকাশে অনেক দূর অবাধ দৃষ্টি চলে যায় , বলাকা চলে যায় দিগন্তে কখনো কাকলি মুখর। মাঠ আর মাঝে মাঝে পিপড়ের লাল লাল ঢিবি। রাস্তাটা দিয়ে গাড়ির চলাচল নেই। আর এপাশে আমাদের দপ্তরের দিকটাতে বিস্তীর্ণ বড় পাহাড় আর পার্বত্য বনভূমি। হনুমান বসে আছে লেজ ঝুলিয়ে , পাচিলের ওপর আর গাছে। বড় বড় লালচে পাথুরে পাহাড়। এইসব দেখে হেটে বেরিয়ে আসতাম আমরা।
আজ আর পিছনের দুটো পাহাড়ের মধ্যে একটা নেই। কোম্পানির বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড় ভেঙ্গে , ডিনামাইট ফাটিয়ে গাছ কেটে তৈরী হতে আমি দেখেছি এই বিল্ডিং। লেগেছে ২ বছর। তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়ে গেছে , ফাটানো হচ্ছে আরেকটা পাহাড়।
হনুমানেরা মাঝে মাঝে চলে আসে আমাদের অফিস এ। রক্ষীরা তাড়িয়ে দেয়।
নতুন করে গাছ লাগিয়ে বাগান করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাস্তুতন্ত্রকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে , হয়ত সফল এবং খাপছাড়া বনের থেকে বেশি সুদৃশ্য , সংহত কিন্তু সেই আরণ্যক গরিমা আর নেই , আছে শুধু আমাদের স্মৃতি তে।
সেই বনভূমি আর সাড়া দেয় না , তার জায়গা নিয়েছে ইমারত।
আর কত বিকাশ মানুষকে তৃপ্তি দেবে আর কতদিনে মানুষ সন্তুষ্টি লাভ করে সভ্যতা কে সম্পৃক্ত করার কথা ভাববে কে জানে। আরও কত পাহাড় ফাটানোর পর বনভূমি মুক্তি পাবে বনদেবতা ই বলতে পারেন। জুলে ভার্ন একটি উপন্যাসে একটি চরিত্রের সংলাপ লিখেছিলেন ভাগ্যিস পৃথিবী পুরোটা কয়লা নয় - তাহলে অনেক আগেই তা জ্বলে ছাই হয়ে যেত লোকের হাতে।
বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন আরণ্যক , তাতে সেই এক ই ছবি। ওঁর মত মগ্ন তাপস আবার কবে জন্মাবে কে জানে। আজকের পৃথিবী পেশাদার মানুষের পৃথিবী , সেখানে আদিবাসী নাচগানের স্থান কোথায় ? সেখানে পথের দেবতার আহ্বান আর অরণ্যের ডাক কে শুনবে ? অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার নতুন জোয়ার সব প্রাচীন ধারণা কে তছনছ করে দিয়ে এক আগ্রাসী বেগ মানুষকে দান করেছে যার আকর্ষনী ক্ষমতা হলো ভোগ। পাহাড় ফাটিয়ে অত এব তৈরী হোক বহুতল আপণ।
যারা চাঁদের আলোয় নেচে নেচে গাইত , রাতে যে দেহাতী লোকগুলো কীর্তন গেয়ে মুড়ি পান্তা খেয়ে শুয়ে পরত - খুশি ছিল চাষাবাদ করে , তারা কি খারাপ ছিল ? আজকের নিষ্প্রাণ পেশাদারী থেকে তারা ভালো ছিল না খারাপ এ তর্ক করা বৃথা - হয়ত হাস্যকর। তাদের তো ক্ষমতাই ছিল না ধরিত্রীর রূপ এমন পাল্টে দিয়ে ব্যবহার করার- তাদের সাথে তুলনা করার কোনো যে মানেই নেই। নাগরিক জীবনে তারা এখন ব্রাত্য- তাদের বংশধরেরা এখন নতুন পথেই পা দিয়েছে।
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে
রূপের বীজ ছড়িয়ে চলে পৃথিবীতে
ছড়িয়ে চলে স্বপ্নের বীজ।
অবাক হয়ে ভাবি
আজ রাতে কোথায় তুমি?
রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না-
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে- ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –হয়ে
ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা হো_ হো ক’রে হেসে উঠলোঃ
‘ব্যবহৃত – ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়?’
রূপের বীজ ছড়িয়ে চলে পৃথিবীতে
ছড়িয়ে চলে স্বপ্নের বীজ।
অবাক হয়ে ভাবি
আজ রাতে কোথায় তুমি?
রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না-
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে- ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –হয়ে
ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা হো_ হো ক’রে হেসে উঠলোঃ
‘ব্যবহৃত – ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়?’
জীবনানন্দ দাশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন