শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

Orissa Directorate of Culture

উড়িষ্যা সংস্কৃতি দপ্তরটা একদম ভুবনেশ্বর কোর্ট এর উল্টোদিকে। কাজের সুত্রে আমাকে প্রায় ই কাছারী যেতে হয়।  মাস দুই আগে একবার ইচ্ছে হলো দপ্তরটা ঘুরে যাবার। অফিস থেকে গাড়ি নিয়ে কোর্ট গিয়েছিলাম - একটু অপেক্ষা করার ছিল সেখানে।  তখন পা বাড়িয়ে একবার ঘুরে এলুম।

আমরা যারা কলকাতার নন্দন চত্বর বেড়িয়ে অভ্যস্ত তারা নিতান্ত নিরাশ হব।  এমনিতেই উড়িয়া লোকেরা বিশেষ সাহিত্য সংস্কৃতির ধার ধারে না , হিন্দি সিনেমা ই তাদের বিনোদনের একমাত্র সহায় তা ছাড়া তাদের কোনো সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল কিছুই নেই।  তাদের আচরণ, ভাষা , দৈনন্দিন জীবন ও পরিচ্ছদ সবেতেই হিন্দি ফিল্ম   - ওরা আর কিছু জানেই না।  অল্প স্বল্প কিছু লোক ওডিসি নৃত্য শেখে - কয়েকটা শিক্ষা কেন্দ্র চোখে পরে ভুবনেশ্বরে-কিন্তু গলি গলিতে বলিউড নাচের স্কুল।  বেরহামপুর রৌরকেল্লা আরো কয়েক কাঠি সরেস।  এখানে মনে হবে কলকাতার কোনো মুসলমান পল্লীতে এসে পরেছি লোকজন দেখে।  নেশা এবং মদ্যপান অধিকাংশ প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিত্যকর্ম।  জীবনের উদ্দেশ্য একটি ভালো চাকরি যোগাড়  করা যেন তেন প্রকারেণ এবং গতানুগতিক কাটানো। দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর ম্যানেজমেন্ট কলেজ তাতে সাহায্য করে চলেছে এবং নিজেদের আখের ভালো মতই গুছিয়ে নিচ্ছে।  লোকে দারুন পয়সা চেনে।  প্রোমোটার , অসাধু ব্যাবসায়ী , MLA -MP এবং অতি ধনবান (!)সরকারী অফিসার দের এখানে খুব খাতির।

এহেন কলিঙ্গ রাজ্যে স্বাভাবিক ভাবেই ডিরেক্টরেট অফ culture যে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে তাতে আর আশ্চর্য কী ? মনে পড়ল একবার আমাদের অফিস বিল্ডিং উদ্বোধন করতে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পাট্টনায়ক-কয়েকটি স্কুল পড়ুয়া বাচ্ছা মেয়ে উত্কল জননী গানটি গেয়েছিল।  আমি অফিসের ৮-১০ জনকে জিগ্যেস  করেছিলাম গানটি কার লেখা - কেউ ই বলতে পারেনি - অথচ গানটি এই প্রদেশের প্রাদেশিক গান বা স্টেট সং।  উড়িয়া দেশাত্মবোধক সর্বাধিক জনপ্রিয় গান এটি - ব্রিটিশ আমলে লিখেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত মহাপাত্র।  একজন বলে বসলো এটি উপেন্দ্র ভঞ্জ রচিত - সে বেচারী উড়িয়া সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি উপেন্দ্র ভন্জর রচনাকাল এবং ভাষা কিছুর ই পরিচিতির প্রয়োজন মনে করেনি।  আমি অবধি তৎ ক্ষনাত্  বুঝতে পেরেছিলাম গানটি উপেন্দ্রর রচনা হতেই পারে না রচনারীতি ও ভাষা শুনে।
যাইহোক গেট এ দুজন নিরাপত্তা কর্মী বসেছিলেন, আমাকে এই পান্ডববর্জিত স্থানে কৌতুহলী হয়ে ঢুকতে দেখে একবার কটাক্ষ করে গল্পে জমে গেলেন। আমি ঢুকে গেলুম। গাছপালা জঙ্গল মত, লোকজন বিশেষ চোখে পড়ে  না।  গেটে একটা নাটকের hoarding টানানো- উড়িয়া ভাষায় লেখা নাটকের নামটা ভুলে গেছি , নাট্যকার মনোজ মিত্র - উড়িয়া রূপান্তর। বাঙালি হিসেবে বেশ গর্ব অনুভব হলো।  হা ভাইসব, আমি উড়িয়া ভাষাটা পাঠ করতে পারি।  ঢুকে দুটি মূর্তি- একজন গায়কের আরেকজন কোনো প্রাচীন উড়িয়া কবির।  একটু এগিয়ে নাট্যশালা, প্রবেশপথে কবিসম্রাট উপেন্দ্র ভন্জর আবক্ষ একটি সুন্দর মূর্তি। নাট্যশালা  যেন একেবারে আমাদের একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এর পিছনের প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু জনমানবহীন। বেশ কয়েকটি পুরনো অনাদৃত বড় বড় বিল্ডিং - কিসের বোঝা গেল না।  আরো ভেতরে এগিয়ে দেখা গেল একটি ওয়ার্কশপ চলছে।  নন্দন চত্বরে যেমন pandal  খাটানো হয় , সেরকম খাটিয়ে Temple Mason দের একটি কর্মশালা চলছে। পাথর টাথর রাখা, ৬০-৭০ জন মজুর অংশ নিয়েছে , যন্ত্রপাতি চালানো শিখছে।  বেশ ভালই লাগলো দেখে , মাঝখানে মাল্যভূষিত পক্বকেশ বিশ্বকর্মা ঠাকুরের ছবি।
এরপর ঢুকলাম ডিরেক্টরেট অফ culture বিল্ডিং অভ্যন্তরে। একটা আর্ট গ্যালারি আছে বটে কিন্তু ভিতরে কিছু ছিল না।  কয়েকজন কর্মী দেখলাম আছেন। এই বিল্ডিংটার ভিতর খুব সুন্দর , একটা সুদৃশ্য বাগিচা আছে।  একটা উর্দু শিক্ষা কেন্দ্র আছে - আর উল্লেখযোগ্য কিছুই চোখে পড়ল না।  বেরিয়ে এলাম।  কয়েকজন কবিসাহিত্যিকের ছবি দেয়ালগুলো য় টানানো আছে শুধু।

ফেরার পথে কর্মশালার পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে হা হুতাশ করতে করতে ভাবছিলাম এদেশের এমন রুচি কেন, এর কোনো কি পরিবর্তন  নেই? শুধু ই কী প্রাইভেট কলেজ থেকে পাস করে চাকরি করা এবং  রোজগার করলেই জীবন সার্থক ? আর শম্ভু মিত্র , কুমার রায়ের মত লোকেরা তো এখানে
 উপেক্ষিত , উপহাসের পাত্র- এমন কেন ?  এস বিশ্বকর্মা , এস স্রষ্টা , রসরূপ -মন্ত্র দ্রষ্টা।

শেষ করছি  বন্দে উত্কল জননী গানটির লিংক সংযুক্ত করে। গানের কথা ইন্টারনেট এ পাওয়া যাবে , বুঝতে কোনো কষ্টই হবে না - বাংলা গান বলেও অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।
http://youtu.be/3HPSazNkeXg 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন