রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৩

Book Review: Story of My Life by Fakir Mohan Senapati, Translation by Jatindra K Nayak & Prodeepta Das, Vidyapuri Publications

শ্রী ফকির মোহন সেনাপতির আত্মচরিত উড়িয়া ভাষায় লেখা প্রথম আত্মজীবনী। উড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যের স্থপতিদের মধ্যে উনি অন্যতম। উড়িয়া থেকে ভাষান্তর করা বই The Story of My Life পড়ে যা বোঝা গেল বইটি খুব ই সংক্ষিপ্ত।  অনুবাদক যুগল অলমতি বিস্তারেণ পন্থা অবলম্বন করেছেন নাকি মূল রচনাটাই সংক্ষিপ্ত বলা মুশকিল কারণ আমার উড়িয়া সাহিত্য বিষয়ে অজ্ঞতা। এমনও  হতে পারে লেখকের শেষ জীবনের ভগ্নস্বাস্থ্য বইটার কলেবর বৃদ্ধি এবং অধিকতর ঋদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাস্তবিক । যাইহোক, যেকোনো আত্মজীবনীর মতই এটাও যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক কিন্তু তার চেয়েও বেশী তাত্পর্য্য হলো শুধু এটি প্রথম উড়িয়া আত্মজীবনী বা লেখকের নাম ফকির মোহন বলে নয় এটি যথেষ্ট ঐতিহাসিক।  কারণ ফকির মোহন শুধু সাক্ষীর মত ঘটনা লিখে যাননি তিনি ওড়িশার ইতিহাসের একজন রূপকার তাই তাঁর বর্ণনা ইতিহাস সমৃদ্ধ।

রচনাশৈলী ও প্রকাশভঙ্গীতে বারবার শরত্চন্দ্রর কথা মনে পড়ে  যায়। লেখকের নিজস্ব ভাবনা বা অনুভূতি বিশেষ স্থান পায় নি , কতকটা সাংবাদিক বর্ণনার মত মনে হয় পড়তে পড়তে।  লেখকের কর্ম ও কর্মজীবনের বিস্তারিত কথা লেখা যুক্তিপূর্ণ ভাবে, বিভুতিভূষণের আরণ্যক ধরণের মগ্ন অনুভূতির কোনো জায়গা নেই - কঠোর তথ্যনিষ্ঠ বাস্তব পরিস্থিতির বর্ণনা, অনেকটা অক্ষয় কুমার বড়ালের প্রবন্ধগুলোর মত - মাঝে মাঝে শুধু অল্প অল্প নিজের ইনপুট বা দৃষ্টিভঙ্গীর ছোঁয়া। আমাদের কর্মজীবনের মতই পড়তে পড়তে মাঝে একঘেয়ে লাগছিল।  এমনকি রাজার খরচের হিসেব ও লেখা আছে এক জায়গায়।
লেখকের বর্ণনায় উনবিংশ শতাব্দীর উত্কলের টুকরো টুকরো ছবি পাওয়া যায় যেগুলো পাঠক জুড়ে নিয়ে একটা পরিপূর্ণ ধারণা করতে পারেন , এটাই রচনাটার একটা interactive দিক। কিভাবে এক অনাথ বালক বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে চরম দারিদ্র্যর মধ্যে থেকে উঠে এসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলির যোগ্য হয়ে উঠেছিল, দেশের মানুষের সম্মান লাভ করেছিল নিজের নিঃস্বার্থ কর্ম এবং দেশদশের প্রতি প্রীতি দ্বারা এ হলো সেই কাহিনী। রচনায় রস সৃষ্টির কোনো পরিকল্পিত প্রয়াস দেখা না গেলেও করুণ  রস আর কৌতুক রস সমান ভাবে মিশে আছে। আছে নিজের মা বাবা ভাইদের মৃত্যুর কথা, পুত্রশোকের কথা, দুইবার পত্নীবিয়োগের কথা , পালিকা মাতৃসমা পিতামহীর প্রয়াণের শোকের কথা - কিন্তু সেগুলো অধিক নয়। তার চেয়েও বেশি আছে ১৮৬৬ সালের মারাত্মক দুর্ভিক্ষর কথা।  ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষ আজ এতদিন পরেও ওড়িশাতে কুখ্যাত। সে সময়ে তরুণ  লেখকের মনে গভীর দাগ কেটেছিল অন্নাভাব, অন্নের মূল্যবৃদ্ধি  , সর্বত্র মৃতদেহের স্তুপ, মানুষের পাতা মূল খেয়ে বা উপবাস করে প্রাণধারণ  এবং সবশেষে ত্রান শিবিরের খাদ্য খেয়ে বা ত্রান শিবির যাত্রাপথেই বহু মানুষের প্রাণত্যাগ। এছাড়া আছে দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা। কৌতুক রসের অবতারণা করেছেন লেখক সাহেবদের নিয়ে , এদেশ সম্বন্ধে তাদের অজ্ঞতা আর সীমাবদ্ধ ভাষাজ্ঞান নিয়ে ,  দেশের সামন্ত রাজাদের অযোগ্যতা আর অল্পবুদ্ধি নিয়ে , কেওন্ঝারের ভুইয়া বিদ্রোহ নিয়ে , লোকের অতি চালাকি নিয়ে, লিখেছেন ভন্ড সাধুরা রাজার আতিথ্য গ্রহণ করে রাজার অর্থেই বড়লোক হয়ে কিভাবে রাজারই ঊত্তমর্ণ হয়ে উঠত।

বস্তুত ওড়িশার ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণের অব্যবহিত পরে ফকির মোহনের জন্ম।  ওঁর লেখায় তাই আছে কিভাবে ব্রিটিশ এসে বালেশ্বর অধিগ্রহণ করে নিল, কিভাবে পৈতৃক  জমি হাতছাড়া হয়ে গেল।  দেশে অত্যধিক মৃত্যুহার ছিল, চিকিত্সা ব্যবস্থা বলে কিছুই ছিল না , ছিল কলেরা , ভেদ ইত্যাদি রোগের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব।  শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল খুব ই অপ্রতুল , কুসমস্কার আর অন্ধবিশ্বাস মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আর মানুষ হিন্দুধর্ম ছেড়ে খ্রীষ্টান হয়ে যাচ্ছিল।  লেখক নিজে স্বীকার করেছেন তিনি বন্ধু কবি রাধানাথের সঙ্গে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু তা শেষ অবধি হয়নি , পরে তিনি ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হন।  লেখাপড়া শিখতে শিখতেই ফকির মোহনকে স্কুল ছেড়ে দিতে হয় এবং শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়।  ওঁর কর্মজীবনের উত্থান পতন ও ঘটনা বাহুল্য নিয়েই বইটি ভর্তি। বিশাল কর্মজীবনে উনি প্রচুর ভ্রমণ করেছেন , বিভিন্ন সামন্ত রাজাদের দেওয়ান বা ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেছেন , ব্রিটিশ অফিসার দের সংস্পর্শে এসেছেন - সাহায্য লাভ করেছেন।  Ravenshaw সাহেবের সাথে পরিচিতি ছিল , চিনতেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরকে , কথা বলে এসেছিলেন মাদ্রাসে বাল গঙ্গাধর তিলকের সাথে  কংগ্রেস অধিবেশনে গিয়ে - দিয়েছেন মাদ্রাসএর বর্ণনা।  বারবার তাঁর লেখায় উঠে আসে সামন্ত্রতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্তিম লগ্নের অবক্ষয়ের কথা।  রাজপরিবারের উত্তরসূরীরা বেশিরভাগ ই  অযোগ্য, অনেকেই নাবালক , কেউ মদ্যাসক্ত , কেউ নিরক্ষর আবার কেউ বা ভালো।  ব্রিটিশ অফিসার দের সুপারিশে লেখক নিযুক্ত হতেন দেওয়ান বা ম্যানেজার পদে- লিখে গেছেন সেসব কথা , প্রজাদের বিদ্রোহ আর অসন্তোষের কথা , রাজাদের ঋণগ্রস্ত অবস্থার কথা , মানসিক বিষাদের কথা, ব্রিটিশ শাসকদের হস্তক্ষেপের কথা।  কেওন্ঝার এর ভূঁয়ান বিদ্রোহ দমনের আখ্যান বেশ রোমাঞ্চকর, কোনো এক রাজার পত্নীবিয়োগের পর তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করছিলেন দেওয়ান হয়ে , সে গল্প মজার।

শিক্ষাব্রত আর সাহিত্য সাধনা তাঁর জীবনের অঙ্গ ছিল।  স্কুল তৈরী করেছেন , চালাতে চেষ্টা করেছেন - সে সময়ে সে প্রচেষ্টা ছিল কঠিন।  লিখেছেন কিভাবে কত কষ্ট করে টাকা যোগাড়  করে বালেশ্বর এ প্রেস তৈরী করেছিলেন সে কাহিনী কৌতুকপ্রদ।  প্রগতিশীল হয়ে বাগানে চাষ করেছিলেন প্রথমবার ফুলকপি , টমেটো , গাজর। সবই লিখেছেন।  লিখেছেন বারবার দেশের অরাজক অবস্থার কথা , লুটপাটের  কথা - পথে ডাকাতির কথা - ঠগীদের কথা , কবি বন্ধু রাধানাথ রায়ের কথা, মধুসূদন দাসের কথা। দেশে যোগাযোগ এবং যাতায়াতের কোনরকম ব্যবস্থা ছিল না , লিখেছেন সেকথাও - নিজের খরচে কোনো এক গ্রামে কুয়ো বানিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীদের দুর্দশা দেখে; এছাড়াও পথ বানিয়েছেন , বানিয়েছেন বাজার।  সাহিত্য রচনা করে চলেছেন তার সাথে।

আমরা যারা গর্বভরে ভাষা দিবস এখন পালন করি বাঙালী হিসেবে - ভাবতে অবাক লাগে ১৫০ বছর আগে বাঙালীরাই উড়িয়া ভাষা ও সমস্কৃতি উত্খাত করতে আগ্রাসী হয়ে উঠে পড়ে  লেগেছিল। বাঙালী আর উড়িয়া দুই জাতির মধ্যে বিদ্বেষ তখন অত্যন্ত বেশী ছিল বলে লেখক বর্ণনা করেছেন।  সেমতাবস্থায় সাহিত্য সভা প্রতিষ্ঠা , পত্রিকা প্রকাশ , রচনা ,  উড়িয়া স্কুল বই চালু করা ইত্যাদি তে লেখক মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সময়ের পরিবর্তন তাঁর লেখায় ধরা পড়ে বালেশ্বর বন্দরের বন্ধ হয়ে যাওয়া , বালেশ্বরের লবণ উত্পাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদির বিবরণের মাধ্যমে।  ছোটবেলায় লেখক বন্দরের জাহাজের পাল তৈরীর কাজ তদারক করতেন পারিবারিক ব্যবসা হিসাবে।  বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে লবণ উত্পাদনের কারখানায় লেখালিখির কাজে যোগ দিয়েছিলেন।

বইটি পড়ে বোঝা যায় লেখকের একটা নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা ছিল দেশের মানুষের প্রতি যা তিনি প্রকাশ করেছেন। মাতৃভাষার প্রতি ও অকুন্ঠ অনুরাগ ছিল। দেশের মানুষের প্রতি বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বইতে , ভূমিকায় লিখেছেন উড়িয়া ভাষায় আত্মজীবনী লিখে গেলাম বন্ধুবর্গের অনুরোধে ভবিষ্যতের রচনাকারদের ভিত্তিরূপে মাত্র।  অনুবাদ কার্য সহজ সরল, বাহুল্য বর্জিত। তবে বিশেষ কোনো উল্লেখ্য কিছু নয় বলে মনে  হলো, সাধারণ।    সাহিত্যপ্রেমীদের থেকে বইটা ইতিহাস অনুসন্ধানীর ভালো লাগবে বেশি কারণ তো বেশ বোঝাই যাচ্ছে।




শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৩

একফালি চাঁদ

একফালি চাঁদের আলোয় ভরে গেছে জ্যামিতির খাতা
পড়তে পড়তে দুষ্টু ছেলেটার আজ ধরে গেছে মাথা
সরলরেখা লাগছে মোটে নয়কো সরল আর
দুর্বৃত্ত হয়ে বৃত্ত চারপাশ করছে  ছারখার
জোরে জোরে পাশের বাড়ি বাজছে হিন্দি গান
রাতের বেলা আনন্দে ডাকছে কাদের বান
বাবা বলে 'বাজারেতে আলু  হলো দামী,
দিনরাত খেটেখুটে মরি শুধু আমি
গেল ফাইলিন এলো বন্যা বাড়ল তেলের মূল্য
আমার মতন লোকেদের কপালগুলো  পুড়ল'.




শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৩

একাম্র গ্রন্থ উত্সব, ভুবনেশ্বর ২০১৩

শিরোনাম দেখেই  বোধগম্য যে ব্যাপার টা বইমেলা।  তবে কলকাতা বইমেলার মত এলাহি কান্ড নয় কিন্তু প্রচেষ্টা আছে।  ভুবনেশ্বরের জনতা ময়দানে ফি বছর হয়।

মাঝারি আকারের ৮-১০ টি ষ্টল , ছোট আরো ৮-১০ টি।  ঘুরে দেখতে সময় লাগলো আধ  ঘন্টা।  ভিড় মোটেই নেই - আরাম করে দেখ।  বেশ কিছু লোক গেছে  দেখলাম - ছুটির দিনে কিছু লোক বেড়াতে বেড়াতে ঢুকে পড়েছে, কেউ সপরিবারে বাচ্চা নিয়ে এসেছে , ২-৩ জন গম্ভীর ইন্টেলেকচুয়াল আর অল্প কটি স্কুল কলেজ পড়ুয়া আর পরিচিত হাত ধরাধরি করা হংস মিথুনরা  বিহার করতে এসেছে।  বই এর বিক্রি টিক্রি বেশি নেই , কিছু বাচ্চাদের বই বিক্রি হচ্ছে আর কিছু ছাত্রদের বইপত্র- IIT এবং নানারকম পরীক্ষার গাইড বই।  গেটের সামনে খাবারের দোকানে একটু ভিড় , বেশি নয়। একটা মঞ্চ বেঁধে বক্তৃতা হচ্ছে।

ঘুরতে ঘুরতে মঞ্চের সামনে দাড়িয়ে গেলাম। বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এখনকার খ্যাতিমান উড়িয়া সাহিত্যিক শ্রী শান্তনু মহান্তি। বয়েস ষাট মনে হলো , ভদ্রলোক একটি সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ।  বলছিলেন দেশের বর্তমান সমস্কৃতি ও রুচির দুর্দশার কথা।  মানুষের চরিত্র গঠনে সাহিত্যের ভূমিকার কথা- আদর্শের কথা।  উনি যখন Ravenshaw কলেজের ছাত্র ছিলেন সেই সময় ১৯৫১ সালে সবার চোখের সামনে অধ্যক্ষকে রাজনৈতিক গুন্ডাদের হাতে নিগৃহীত হতে দেখেছেন -কলেজের corridor এ কেমব্রিজ এর পিএইচডি শ্রী ব্যান্নার্জী  কে কলার ধরা হয়েছিল। বললেন দেবতার মত মানুষ , স্বামী বিবেকানন্দর মত চেহারার ভদ্রলোকের নিগ্রহের কথা আজ ও পরিষ্কার মনে আছে। যারা কাজটি করেছিল কেউ কেউ আজ মন্ত্রী বা MLA .  এই দেশের সরকার বরাবর শিক্ষা আর জ্ঞানের পরিপন্থী। তখনি ঐ অবস্থা তো এখন আরও শোচনীয় বটেই।  জানা গেল উনি ১৯৫৫ সালের Msc . ভদ্রলোক যথেষ্টই বিবেচনাসম্পন্ন ও সচেতন, ওড়িশা তে এমন লোক বিরল- কিন্তু আছে জেনে খুবই ভালো লাগলো , মঞ্চের সামনে আসনগুলিতে লোক ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। মঞ্চে সেদিন উড়িয়া সাহিত্যের  প্রসিদ্ধ লেখক গোপিনাথ মহান্তি কে স্মরণ করা হচ্ছিল।

আজ যাই অবস্থা হোক কলিঙ্গ তে বঙ্গের মতই উনবিংশ শতাব্দী তে মনীষা এবং সাহিত্য সমস্কৃতির স্ফুরণ সঙ্ঘটিত হয়েছিল - বাংলার রেনেসাঁস এর হাত ধরে এখানেও ব্রাহ্ম সমাজ স্থাপনা হয়েছিল , তৈরী হয়েছিল Ravenshaw কলেজ, চর্চা শুরু হয়েছিল জ্ঞান বিজ্ঞান সাহিত্য শিল্প।  সেসব এখন বিস্মৃতির অতলে চর্চার এবং চেতনার অভাবে। কবিবর রাধানাথ রায়ের কিছু বই দেখলাম , ছিল উড়িয়া সাহিত্যের 'বঙ্কিমচন্দ্র ' শ্রী ফকির মোহন সেনাপতির রচনাবলী , কবি মধুসূদন দাস আর গোপবন্ধু  দাসের বই ও চোখে পড়ল।  শিশু কিশোর সাহিত্য বলে কিছু নেই , প্রচুর ধার্মিক পুস্তক - জ্যোতিষ , তন্ত্র মন্ত্র।  আর ছিল রান্নার বই।  শরত্চন্দ্র  উপন্যাসের অনুবাদ, বিমল মিত্রর আসামী হাজির অনুবাদ - রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ অনুবাদ আর কিছু রবীন্দ্রকাব্যের অনুবাদ।  এছাড়া ছিল গান্ধীজির বই এর অনুবাদ , শেক্সপীয়ার , ও হেনরি  ও  Sherlock Holmes অনুবাদ ইত্যাদি।  প্রাচীন  উড়িষ্যা আদিবাসীদের ছোট একটা রূপকথার সংকলন বই দেখে একটু আগ্রহ হলো।  কয়েকটা পত্রিকার ষ্টল আর খবরের কাগজের ২ টো  ষ্টল।

দেখা এখানেই শেষ।  মেলাটা অনেকটা কলকাতার ছোট ছোট বৈমেলাগুলোর মত - যেমন ঢাকুরিয়া বইমেলা বা বেহালা বইমেলা।  (এখন কী আর ওগুলো হয়?) ব্লগ লিখে রাখলাম , পরে যদি কখনো পড়ি  মনে পড়বে , চোখে ভাসবে। কারো যদি ভালো লাগে এটা পড়ে - উড়িয়া সাহিত্যর ওপর একটু আগ্রহ জন্মায় তাহলে আগামী কলকাতা বইমেলায় শ্রী ফকির মোহন  সেনাপতির রচনাবলীর অনুবাদ সংগ্রহ করতে অনুরোধ করব।  আশা করি বইপ্রেমীর ভালই লাগবে - ছোটগল্প গুলো ওয়ার্ল্ড ক্লাস বলে পরিচিত ,  যদিও দুর্নাম আছে এই বলে যে মুন্সী প্রেমচাঁদ আর বঙ্কিমের থেকে চুরি করা। আত্মচরিত টা প্রথম ওড়িয়া আত্মজীবনী এবং ইতিহাস জড়ানো।  সেনাপতির ভাষা বঙ্কিমের মত কঠিন গদ্য নয় - অত লেখাপড়া করার সুযোগ উনি পান নি, কিন্তু ফকির মোহন কে নিয়ে গবেষণা হয়।



বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৩

অফিস এর নতুন বিল্ডিং যেখানে তৈরী হচ্ছে সেখানে যেন একটা মস্ত বড়  কবর খোঁড়া। এত বড় excavation আমি আর দেখিনি। তৈরী হবে তথ্যপ্রযুক্তি ইমারত। অর্থনৈতিক বিকাশ আর বাধা মানছে না, চারিদিকে উন্নতি আর অগ্রগতির জয়জয়কার। কিন্তু কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে না ?  

৩ বছর আগে যখন ভুবনেশ্বরে বদলি হয়ে এলাম তখন চন্দ্রশেখরপুর reserve ফরেস্ট এর অন্তর্গত SEZ শিল্পাঞ্চল হিসাবে চিন্হিত স্থানে আমাদের কোম্পানির একটাই বিল্ডিং ছিল।  বাগান ঘেরা।  শুনতাম জঙ্গল কেটে পাহাড় ফাটিয়ে তৈরী হয়েছে, আগে হাতী আসত, প্রচুর সাপ ছিল, সাপুড়ে দের ডাকা হয়েছিল, বাঘ ছিল, আদিবাসীরা ছিল, এমনি আরো কত কি।  নিজের চোখে দেখিনি।  তবে হা , যখন বিকেলে ঘুরতে বেরোতাম পিছনদিকটা , সেদিকটা ভারি চমত্কার লাগত।  অপরাহ্নের গোধুলি আলোয় খোলা আকাশে অনেক দূর অবাধ দৃষ্টি চলে যায় , বলাকা চলে যায় দিগন্তে কখনো কাকলি মুখর।  মাঠ আর মাঝে মাঝে পিপড়ের লাল লাল ঢিবি।  রাস্তাটা দিয়ে গাড়ির চলাচল নেই। আর এপাশে আমাদের দপ্তরের দিকটাতে বিস্তীর্ণ বড় পাহাড় আর পার্বত্য বনভূমি।  হনুমান বসে আছে লেজ ঝুলিয়ে , পাচিলের ওপর আর গাছে।  বড়  বড় লালচে পাথুরে পাহাড়। এইসব দেখে হেটে বেরিয়ে আসতাম আমরা।  

আজ আর পিছনের দুটো পাহাড়ের মধ্যে একটা নেই।  কোম্পানির বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড় ভেঙ্গে , ডিনামাইট ফাটিয়ে গাছ কেটে তৈরী হতে আমি দেখেছি এই বিল্ডিং।  লেগেছে ২ বছর। তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়ে গেছে , ফাটানো হচ্ছে আরেকটা পাহাড়। 
হনুমানেরা মাঝে মাঝে চলে আসে আমাদের অফিস এ। রক্ষীরা তাড়িয়ে দেয়। 
নতুন করে গাছ লাগিয়ে বাগান করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাস্তুতন্ত্রকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে , হয়ত সফল এবং খাপছাড়া বনের থেকে বেশি সুদৃশ্য , সংহত কিন্তু সেই আরণ্যক গরিমা আর নেই , আছে শুধু আমাদের স্মৃতি তে।  
সেই বনভূমি আর সাড়া  দেয়  না , তার জায়গা নিয়েছে ইমারত। 
 আর কত বিকাশ মানুষকে তৃপ্তি দেবে আর কতদিনে মানুষ সন্তুষ্টি লাভ করে সভ্যতা কে সম্পৃক্ত করার কথা ভাববে কে জানে।  আরও কত পাহাড় ফাটানোর পর বনভূমি মুক্তি পাবে বনদেবতা ই বলতে পারেন।  জুলে ভার্ন একটি উপন্যাসে একটি চরিত্রের সংলাপ লিখেছিলেন ভাগ্যিস পৃথিবী পুরোটা কয়লা নয় - তাহলে অনেক আগেই তা জ্বলে ছাই হয়ে যেত লোকের হাতে।  
বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন আরণ্যক , তাতে সেই এক ই ছবি। ওঁর মত মগ্ন তাপস আবার কবে জন্মাবে কে জানে। আজকের পৃথিবী পেশাদার মানুষের পৃথিবী , সেখানে আদিবাসী নাচগানের স্থান কোথায় ? সেখানে পথের দেবতার আহ্বান আর অরণ্যের ডাক কে শুনবে ? অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার নতুন জোয়ার সব প্রাচীন ধারণা কে তছনছ করে দিয়ে এক আগ্রাসী বেগ মানুষকে দান করেছে যার আকর্ষনী ক্ষমতা হলো ভোগ। পাহাড় ফাটিয়ে অত এব তৈরী হোক বহুতল আপণ। 
যারা চাঁদের আলোয় নেচে নেচে গাইত , রাতে যে দেহাতী লোকগুলো কীর্তন গেয়ে মুড়ি পান্তা খেয়ে শুয়ে পরত - খুশি ছিল চাষাবাদ করে , তারা কি খারাপ ছিল ? আজকের নিষ্প্রাণ পেশাদারী থেকে তারা ভালো ছিল না খারাপ এ তর্ক করা বৃথা - হয়ত হাস্যকর। তাদের  তো ক্ষমতাই ছিল না ধরিত্রীর রূপ এমন পাল্টে দিয়ে ব্যবহার করার- তাদের সাথে তুলনা করার কোনো যে মানেই নেই।  নাগরিক জীবনে তারা এখন ব্রাত্য- তাদের বংশধরেরা এখন নতুন পথেই পা দিয়েছে।  

আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে
রূপের বীজ ছড়িয়ে চলে পৃথিবীতে
ছড়িয়ে চলে স্বপ্নের বীজ।
অবাক হয়ে ভাবি
আজ রাতে কোথায় তুমি?
রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না-
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে- ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –হয়ে
ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা হো_ হো ক’রে হেসে উঠলোঃ
‘ব্যবহৃত – ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়?’     
                                                                       জীবনানন্দ দাশ 

শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

Orissa Directorate of Culture

উড়িষ্যা সংস্কৃতি দপ্তরটা একদম ভুবনেশ্বর কোর্ট এর উল্টোদিকে। কাজের সুত্রে আমাকে প্রায় ই কাছারী যেতে হয়।  মাস দুই আগে একবার ইচ্ছে হলো দপ্তরটা ঘুরে যাবার। অফিস থেকে গাড়ি নিয়ে কোর্ট গিয়েছিলাম - একটু অপেক্ষা করার ছিল সেখানে।  তখন পা বাড়িয়ে একবার ঘুরে এলুম।

আমরা যারা কলকাতার নন্দন চত্বর বেড়িয়ে অভ্যস্ত তারা নিতান্ত নিরাশ হব।  এমনিতেই উড়িয়া লোকেরা বিশেষ সাহিত্য সংস্কৃতির ধার ধারে না , হিন্দি সিনেমা ই তাদের বিনোদনের একমাত্র সহায় তা ছাড়া তাদের কোনো সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল কিছুই নেই।  তাদের আচরণ, ভাষা , দৈনন্দিন জীবন ও পরিচ্ছদ সবেতেই হিন্দি ফিল্ম   - ওরা আর কিছু জানেই না।  অল্প স্বল্প কিছু লোক ওডিসি নৃত্য শেখে - কয়েকটা শিক্ষা কেন্দ্র চোখে পরে ভুবনেশ্বরে-কিন্তু গলি গলিতে বলিউড নাচের স্কুল।  বেরহামপুর রৌরকেল্লা আরো কয়েক কাঠি সরেস।  এখানে মনে হবে কলকাতার কোনো মুসলমান পল্লীতে এসে পরেছি লোকজন দেখে।  নেশা এবং মদ্যপান অধিকাংশ প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিত্যকর্ম।  জীবনের উদ্দেশ্য একটি ভালো চাকরি যোগাড়  করা যেন তেন প্রকারেণ এবং গতানুগতিক কাটানো। দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর ম্যানেজমেন্ট কলেজ তাতে সাহায্য করে চলেছে এবং নিজেদের আখের ভালো মতই গুছিয়ে নিচ্ছে।  লোকে দারুন পয়সা চেনে।  প্রোমোটার , অসাধু ব্যাবসায়ী , MLA -MP এবং অতি ধনবান (!)সরকারী অফিসার দের এখানে খুব খাতির।

এহেন কলিঙ্গ রাজ্যে স্বাভাবিক ভাবেই ডিরেক্টরেট অফ culture যে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে তাতে আর আশ্চর্য কী ? মনে পড়ল একবার আমাদের অফিস বিল্ডিং উদ্বোধন করতে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পাট্টনায়ক-কয়েকটি স্কুল পড়ুয়া বাচ্ছা মেয়ে উত্কল জননী গানটি গেয়েছিল।  আমি অফিসের ৮-১০ জনকে জিগ্যেস  করেছিলাম গানটি কার লেখা - কেউ ই বলতে পারেনি - অথচ গানটি এই প্রদেশের প্রাদেশিক গান বা স্টেট সং।  উড়িয়া দেশাত্মবোধক সর্বাধিক জনপ্রিয় গান এটি - ব্রিটিশ আমলে লিখেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত মহাপাত্র।  একজন বলে বসলো এটি উপেন্দ্র ভঞ্জ রচিত - সে বেচারী উড়িয়া সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি উপেন্দ্র ভন্জর রচনাকাল এবং ভাষা কিছুর ই পরিচিতির প্রয়োজন মনে করেনি।  আমি অবধি তৎ ক্ষনাত্  বুঝতে পেরেছিলাম গানটি উপেন্দ্রর রচনা হতেই পারে না রচনারীতি ও ভাষা শুনে।
যাইহোক গেট এ দুজন নিরাপত্তা কর্মী বসেছিলেন, আমাকে এই পান্ডববর্জিত স্থানে কৌতুহলী হয়ে ঢুকতে দেখে একবার কটাক্ষ করে গল্পে জমে গেলেন। আমি ঢুকে গেলুম। গাছপালা জঙ্গল মত, লোকজন বিশেষ চোখে পড়ে  না।  গেটে একটা নাটকের hoarding টানানো- উড়িয়া ভাষায় লেখা নাটকের নামটা ভুলে গেছি , নাট্যকার মনোজ মিত্র - উড়িয়া রূপান্তর। বাঙালি হিসেবে বেশ গর্ব অনুভব হলো।  হা ভাইসব, আমি উড়িয়া ভাষাটা পাঠ করতে পারি।  ঢুকে দুটি মূর্তি- একজন গায়কের আরেকজন কোনো প্রাচীন উড়িয়া কবির।  একটু এগিয়ে নাট্যশালা, প্রবেশপথে কবিসম্রাট উপেন্দ্র ভন্জর আবক্ষ একটি সুন্দর মূর্তি। নাট্যশালা  যেন একেবারে আমাদের একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এর পিছনের প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু জনমানবহীন। বেশ কয়েকটি পুরনো অনাদৃত বড় বড় বিল্ডিং - কিসের বোঝা গেল না।  আরো ভেতরে এগিয়ে দেখা গেল একটি ওয়ার্কশপ চলছে।  নন্দন চত্বরে যেমন pandal  খাটানো হয় , সেরকম খাটিয়ে Temple Mason দের একটি কর্মশালা চলছে। পাথর টাথর রাখা, ৬০-৭০ জন মজুর অংশ নিয়েছে , যন্ত্রপাতি চালানো শিখছে।  বেশ ভালই লাগলো দেখে , মাঝখানে মাল্যভূষিত পক্বকেশ বিশ্বকর্মা ঠাকুরের ছবি।
এরপর ঢুকলাম ডিরেক্টরেট অফ culture বিল্ডিং অভ্যন্তরে। একটা আর্ট গ্যালারি আছে বটে কিন্তু ভিতরে কিছু ছিল না।  কয়েকজন কর্মী দেখলাম আছেন। এই বিল্ডিংটার ভিতর খুব সুন্দর , একটা সুদৃশ্য বাগিচা আছে।  একটা উর্দু শিক্ষা কেন্দ্র আছে - আর উল্লেখযোগ্য কিছুই চোখে পড়ল না।  বেরিয়ে এলাম।  কয়েকজন কবিসাহিত্যিকের ছবি দেয়ালগুলো য় টানানো আছে শুধু।

ফেরার পথে কর্মশালার পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে হা হুতাশ করতে করতে ভাবছিলাম এদেশের এমন রুচি কেন, এর কোনো কি পরিবর্তন  নেই? শুধু ই কী প্রাইভেট কলেজ থেকে পাস করে চাকরি করা এবং  রোজগার করলেই জীবন সার্থক ? আর শম্ভু মিত্র , কুমার রায়ের মত লোকেরা তো এখানে
 উপেক্ষিত , উপহাসের পাত্র- এমন কেন ?  এস বিশ্বকর্মা , এস স্রষ্টা , রসরূপ -মন্ত্র দ্রষ্টা।

শেষ করছি  বন্দে উত্কল জননী গানটির লিংক সংযুক্ত করে। গানের কথা ইন্টারনেট এ পাওয়া যাবে , বুঝতে কোনো কষ্টই হবে না - বাংলা গান বলেও অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।
http://youtu.be/3HPSazNkeXg 
আমার মায়ের পানে বারে বারে দেখ না চেয়ে মন
বিষয় বিষ মেখে মেখে দু হাত পেতে থেকে থেকে
কি যে হবে ফলের আশায় কেটে যায় ইহজীবন
মায়ের দু চোখ সন্তানের দিকে
যথা মমতায় অপলকে
তেমনি করে মায়ের দিকে স্থির কর নয়ন
কালে কালে সবই হবে কাল ই ফের সব লয়ে যাবে
কালী নামের কালিমাতে কাল হবে হরণ
কালী রূপের আঁধার কালো দেখা কি যায় আঁখিতে ভালো
জ্যোতিরুপে মনের ঘরে যতদিন না করেন আলো ?
তেমন হলে মহামন্ত্রে মুনি ঋষি করেন বরণ
তাই হৃদ্সাগরে ডুব দিয়ে নে করে নে তোর মুক্তা চয়ন
আর হৃদকমলে ধ্যান কর রে কালো কালো দুটি চরণ
সে পথ খুঁজে পাবে রে মন  যে পথে যান সাধক গুরুজন
খেলনা সকল তেয়াগ করে মায়ের ছেলে ফিরবে ঘরে

দু চোখের না আড়াল হবে মায়ে ছেলে পাবে দরশন

শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৩

নব উপচারে পূজারম্ভ

অনেক ভেবেচিন্তে আমি কালীপুজোর দিনটা চয়ন করলাম আমার নবরসতর ব্লগ রচনা শুরু করার জন্য। নবরসতর কথাটা কবি রায়গুনাকর ভারতচন্দ্রের থেকে ধার নেয়া। ভারত কবির বিদ্যাসুন্দর কাব্য আজকে প্রাসঙ্গিক (যদিও নবরসতর কথাটা অন্নদামঙ্গল থেকে নেওয়া ) কারণ আজ যে কালীপুজো। শুধু ভারতচন্দ্র নন বিদ্যাসুন্দর রচনা করেছিলেন আবার স্বয়ং অমর মাতৃসাধক কবি রামপ্রসাদ, যে কাব্যের নাম মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেয়া-কবিরঞ্জন বিদ্যাসুন্দর। দ্বিতীয় কাব্য ভক্ত সাধকদের কাছে আদরণীয় কারণ তাতে ভক্তিরস ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব মাখোমাখো। প্রথমটি আমাদের মত জনগনের কাছে কমন এন্টারটেইনমেন্ট, তাই অত্যধিক জনপ্রিয়। এ নিয়ে পরে একটা বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইলো। 

যাইহোক সরস্বতী পুজোর বদলে শ্যামা পূজার দিনেই হাতেখড়ি টা সেরে ফেললাম। আর তর সইলো না।  আফটার অল মায়েরই  তো ভিন্ন রূপ , তাই আর ভাবনা কিসের ? অনেক আগে এক পত্রিকায় পড়েছিলাম মায়ের যে রূপে ভায়োলেন্স আছে সেটা মর্ত্যে সুপার হিট - অতএব ভাসাও তরণী অবিলম্বে। যদিও হাতেখড়ি নেহাত কথার কথা - এখন তো এভরিথিং ডিজিটাল। খড়ি টা একদম পুরনো।  ভারতচন্দ্র বা রামপ্রসাদ যদি আজকের দিনে জন্মাতেন তাহলে হয়ত কি লিখতেন কে জানে, আমার মত ব্লগ লিখতে বসতেন হয়ত। 
বাস্তবিক আজকের দিনে আগেকার মত পান্ডুলিপি বগলে মাগাজিনের অফিস অফিস ঘুরতে হবে না, রয়েছে হাতের কাছে বৈদ্যুতিক সমাজ মাধ্যম- যখন তখন যা খুশি ফেলে দাও, যে খাবে খাবে নয়তো থাকবে পড়ে ।  রামমোহন, উইল্লিয়াম কেরী বাংলায় ছাপাখানা বানানোর চেষ্টায় ছিলেন, এখন তো কোনো ব্যাপার ই নয় বাংলায় টাইপ করে পোস্ট করা- জলবৎ তরলং।  ভাবতে  ইচ্ছে করে ওনারা ব্লগ লিখলে কেমন খোলতাই হতো।  এখন তো সব্বাই ব্লগের কল্যানে লেখক, ওনারা কতটা কলকে পেতেন সন্দেহ। হয়ত দেখা যেত বিদ্যাসাগর মার্কিন মুল্লুকে গবেষণা রত আর রামমোহন সফটওয়্যার কোডিং  করতে করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন নয়তো অন্না হাজারের মত মিডিয়ার খোরাক হয়ে গেছেন। 
সুতরাং আমাদের মত ভদ্র বঙ্গ সন্তান যদি সারস্বত সাধনা করতে চায় তাহলে  সহজ উপায়  হলো ব্লগ, যা আজকে পত্রিকার জায়গাটা দখল করে নিয়েছে।  বই নয় , পত্রিকা নয় , সরস্বতীর অভাগা ভক্তরা এখন ভিড় করতে পারেন ব্লগে।  সরস্বতী মায়ের নব উপচার ব্লগ।  তাই , হে পাঠকবৃন্দ , আমাকেও একটু জায়গা দিন এই মন্দিরে বসতে।