রবিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৪

রাস্তার ধারের আলো

রাস্তার ধারের শেষ আলোটা
 তোমার ই মত চেয়ে চেয়ে থাকে আমার দিকে -
প্রতিরাতে ঘরে ফেরার সময় মোড় ঘোরার আগে,
আমি একবার করে তাকিয়ে দেখি।
তোমার মতই কিছু বলতে চায়
হয়ত অব্যক্ত ভাষায়।

আমার এই যত্সামান্য চাকরির রোজগার
আর আগামী বানানোর স্বপ্ন
তোমার সংসার সাজাতে অপারগ।
সবান্ধবে আমি সাজিয়ে নিয়েছি আরেক বড়  সংসার ,
অনাথ বালকদের আশ্রম - আমরা আগামী বানাতে চাই।
 সবই কি তুমি জানো ?  জানি না
কেন তুমি অমন করে চেয়ে আজো
কি যে দেখো আমার পানে।

রাস্তার ধারের আলোটা জানালা দিয়ে চেয়ে থাকে
যদি পারো আমাকে আর আমার বৃহত্তর সংসারকে
একটু আলো দিও।


রবিবার, ১ জুন, ২০১৪

কাল রাতের ঝরে হারিয়েছে প্রাণ
   আমার পোষা পাখী ,
ভোরের আলো ফুটল  যখন
আর সে দেয় নি ডাকি।
সকাল বেলায় চোখ মেলেছি
  পোহালো যবে  রাতি ,
 দেখি আমার এ শূন্য বিজন নিকেতনে
পক্ষগুলি ছড়িয়ে দিয়ে ভ্রান্ত অযতনে
পিঞ্জর ছেড়ে কোন সে দিশায়
চলে গেছে মোর একলা ঘরের সাথী। 

শুক্রবার, ৩০ মে, ২০১৪

মর্ম সন্ধান

নিজের মর্ম গভীরে
   যেদিন চেয়ে দেখলাম একবার
খুঁজতে চেয়েছিলাম অন্য এক জগৎ একঘেয়েমি কাটাতে।
দেখতে পেলাম এক মন্দস্রোতা নদী ,
পরিষ্কার ঝিলিমিলি জল।
ছোটবেলায় পড়া গল্পের মতন
তার তীরে এক তপোবন ;
নদীর জলে দেখা আমার ছায়া কী আমার ছোটবেলার মুখ ?
মনে পড়ছে না।
সেই পায়ে চলা পথ -
পায়ে পায়ে এগিয়ে চলি
দু পাশের শোভা দেখতে দেখতে আর
কল কাকলি শুনতে শুনতে ঐ পর্ণকুটিরের দিকে।
   শীতল ছায়া ঘেরা কুটিরে গিয়ে এগিয়ে গেলাম
সামনে বসে আছেন কোনো জ্যোতিস্মান মহাত্মা।
সান্নিধ্যে গিয়ে নিয়ে নিলাম ,
বরিষ ধারা মাঝে শান্তির বাণী।
ভুলে গেলাম বদ্ধ জীবনের
   গ্লানি ক্লান্তি খেদ ছিল যত -
হারিয়ে গেলাম কিছুক্ষণ।
সম্বিত্ ফিরে পেয়ে ফিরে আসার আগে
বলেছিলেন 'আবার এস , আবার।'



বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৪

খাপছাড়া দুনিয়ায়

কটক রোড দিয়ে পুরীর দিকে যাবার পথে ভুবনেশ্বর শহর ছাড়িয়ে ৪ কিলোমিটার মধ্যেই গাড়ি ডান দিকে ঘুরে গেল।  জায়গার নাম চক্রপদা। কোথায় যাব জানি না , প্রশ্ন না করেই দুপাশের মাঠঘাট দেখতে লাগলাম ডাক্তারবাবুর পাশে বসে।

দুদিন আগেই এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। আমাদের বেসরকারী নার্সিং হোমে ভাঙচুর হয়ে গেছে ব্যাপক ভাবে। ডাক্তার ব্যানার্জীর এই নার্সিং হোমে  এমন ঘটনা এই প্রথম। একটি ইনজেকশন দেবার পরে এক রোগীর আকস্মিক অভাবিত মৃত্যু হয়ে যায়। এতে ডাক্তার বেচারীর কোনো দোষ ছিল না।  কিন্তু উত্তেজিত জনতা আমাদের এখানে আক্রমন করে। আমি এখানে চার মাস হলো PRO হয়ে এসেছি ; ডাক্তার ব্যানার্জী আমাকে অকুস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান এবং কোনরকম বাধা দিতে কিম্বা বচসা করতে বারণ করেন। কান্ড সমাপ্ত হলে আমরা ফিরে গিয়েছিলাম সব দেখাশোনা করতে।
সন্ধ্যাবেলা ডাক্তারবাবুর কামরায় ওঁর সঙ্গে বসে ছিলাম। বিশেষ কোনো কথাবার্তা হয়নি। আজ সকালে উনি বললেন 'চল রায় , আজ তোমাকে একটা জিনিস দেখাই' . তারপর এই বেরিয়ে পড়া।

এ রাস্তায় গাড়ি বেশি নেই।  শুধু মোটর সাইকেল। দুপাশের শ্যামলিমা রোদে যেন আরো চকচক  করছে। 'আর মিনিট পনেরো ' বললেন ডাক্তারবাবু।

আমরা পৌঁছলাম একটা পাঁচিল ঘেরা বাগানবাড়ির সামনে।  গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম গেট খুলে। বাচ্চাদের কলরব কানে এলো। বাড়ির দিকে যেতেই এক ভদ্রমহিলা ডাক্তারবাবুকে ডেকে  নিয়ে গেলেন, আমি অনুসরণ করলাম। এটা একটা ইস্কুল।

'আমি এখানে বাচ্চাদের রেগুলার চেক আপ করতে আসি '- বললেন ডাক্তারবাবু। 'এটা হলো অবৈতনিক এক অনাথ আশ্রম। এদিকে চলে এস ' .
আমরা ঢুকলাম একটা ঘরে - অফিসঘর। অল্পবয়েসী আমার মত একটি ছেলে বসে , দেখে হেসে বসতে বলল। ছেলেটি বিহারী। ডাক্তারবাবু জানালেন তিন বছর হলো ছেলেটি এই অনাথ আশ্রম খুলেছে। ওর বাবা আই এই টি র অধ্যাপক ছিলেন।  ও আই  আই টি থেকে পাশ করে নিজের মাথা খেয়ে অবৈতনিক অনাথ আশ্রম বানিয়ে বসেছে।

আমরা আলাপ করলাম।  ডাক্তারবাবু কাজে চলে গেলেন। আলাপ করে ভালো লাগলো। কিন্তু ছেলেটি মৈত্রীপূর্ণ ব্যবহার করতে জানে না - কাজে ব্যস্ত ব্যস্ত ভাব সবসময়। আমাকে ঘুরে দেখালো তার আশ্রম। বলল সরকারী অনুদানেই আশ্রম চলে কোনরকমে।

প্রায় ঘন্টা তিন কেটে গেল ওখানে। ডাক্তারবাবু ফিরে বললেন 'কেমন লাগলো ? চল এবার ফেরা যাক। '
গাড়িতে উঠে বসলাম আমি আবার আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ডাক্তার বাবুর এহেন যন্ত্রণা উপশমের উপায় দেখে বিস্মিত হলাম - কতরকম যে হয় মানব চরিত্র ! কখনো কখনো মনে হয় এদের সাথে আগে কেন দেখা হয়নি , আবার কখনো মনে হয় এ আপদ কবে বিদায় হবে।

যারা দুদিন আগে ডাক্তারবাবুকে হেনস্থা করেছিল তারা ওঁর এই কর্মপন্থা কী জানে ? জানলে কী  ও কাজ করত ? আমি নিজে কখনো পারব ? মানবচরিত্রের খবর কতদূর কে রাখতে সক্ষম হয় ? যতই দিন যাচ্ছে , ইন্টারনেট , ইমেইল , মোবাইল সব দূরত্ব মুছে দিচ্ছে।  কিন্তু এই খাপছাড়া দুনিয়ায় মানসিক দূরত্ব এখনো একই রকম। লোকে খাপছাড়া কান্ডে নিজের বিচার বুদ্ধি কাজে লাগানো ছাড়া কোনো উপায় খুঁজে পায়না। মনের প্রসার হয়ত আরো অনেক যুগের প্রয়াসের আবশ্যক পরিণতি।



রবিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৪



 প্রখ্যাত রহস্য লেখক হেমেন্দ্র কুমার রায়ের পিতা দিনেন্দ্র কুমার রায় লিখিত জার্মান রাজা কাইজার এর ব্যক্তিগত চরিত্র পড়তে পড়তে অকস্মাৎ একটা জায়গায় থমকে গেছি।  যুদ্ধের নায়ক রাজা মহাশয়ের নিজস্ব একজন রূপকার ছিলেন - যিনি ওই বহুকথিত গুম্ফের আবিষ্কর্তা।



রূপকার বলতে আমি কি বোঝাতে চাইছি সেটা নিশ্চয় স্পষ্ট এখন।
সেই নরসুন্দরের নাম হলো হের হাবি।  হাঁ , দিনেন্দ্র কুমার নরসুন্দর কথাটাই ব্যবহার করেছেন।  তাহলে দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যচর্চা আর সৌন্দর্যসেবা ব্যাপারটা নিতান্ত আধুনিক নয়। নরসুন্দর কথাটিও তো তত্সম , তাহলে আজকের বিউটি থেরাপিস্ট দের ও একটা সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে বলে মানতে হবে।  নরসুন্দর সমাস কী ? মাস্টারমশাই রা ক্লাসঘরে পড়া  ধরে আলোচনা করতে পারেন।  কিন্তু যদি কথাটার লিঙ্গান্তর করার চেষ্টা করা হয় ? কোনো মহিলা তো রাজার রূপের দায়িত্ব নিতেই পারেন রানিমায়ের অনুমতি নিয়ে অথবা  রানিমা নিজেই করতে পারেন।  তাঁকে কি বলা হবে? আবার রানিমায়ের রূপের  পরাকাষ্ঠা দেখাতে স্ত্রী বা পুরুষ উভয়েই যত্নবান হতে পারেন।  তখন তাঁকে কী বলা হবে ? খুব গোলমালে পড়া গেল দেখছি !
গুম্ফ হলো মানব শরীরে পুরুষের লক্ষ্মণ, পৌরুষের আস্ফালন প্রকাশ করতে বরাবর পুরুষ গুম্ফ পরিচর্যা করে এসেছে  যেমন নিজের কাঁধে লাগিয়েছে বীরত্বদ্যোতক পদক।  হিটলার তাঁর গোঁফ নিয়ে অসংখ্য চিত্র আলোকিত করে আছেন, তিনিও জার্মান এবং স্বভাব চরিত্র অদ্ভূত ভাবে আমাদের পূর্বোক্ত রাজার অনুরূপ।  প্রথমজন প্রথম ও দ্বিতীয় জন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রবক্তা। জনৈক রুশ রাষ্ট্রপতির গোঁফ তো রসিকতার কারণ ছিল; তিনি নাকি সহ্য করতে পারতেন না আর কেউ সেরকম গোঁফ রাখলে - এই নিয়েও রসিকতা প্রচুর আছে।
দিনেন্দ্র কুমার লিখেছেন হাবি একটি আরক তৈরী করতেন ঐ গোঁফের জন্য যা সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।  কিন্তু সুচতুর হাবি করলেন কি , ফ্যাশন এর মর্ম বুঝে একরকম কাম্বিশের গুম্ফ কৌপিন  তৈরী করলেন। কায়দা করে ভেজা গোঁফটাকে সেই কাম্বিসের সাহায্যে বেঁধে দিতে হয় উর্ধ্বমুখী করে আর কৌপিন পড়তে হয় ওষ্ঠের ওপরে। ব্যস , হু হু করে তাই বিক্রি করে হাবি বেশ দু মার্ক করে নিলেন। রাজামশাই দেশ শুদ্ধ লোকের এহেন প্রহসন সহ্য না করে নিজের গোঁফ আবার অধোমুখী রাখলেন। প্রজারাও তাঁকে অনুসরণ করে মহাজনো যেন গতঃ সঃ পন্থাঃ ফের অবলম্বন করেছিলেন কিনা বইটাতে তা আর লেখা নেই। এ যেন আবোল  তাবোলের  সেই ছড়াটাকে মনে পড়িয়ে  দেয় , তাই না ? শেষের দু লাইন তো মোক্ষম।

শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০১৪

শুধিয়ে শুধিয়ে হয়রান আমি
বারেবারে বসন্ত এসে চলে যায় নিরুত্তর-
হলুদ উষ্ণীষ মাথায় মন ভুলিয়ে মাতায় ,
তবু কহে না কো কভু।
কুসুম পিকরব বর্ণ গন্ধ  মন্দ মারুত্
আমিও কবে হব তার দূত
তেমনি ডাক দেব ফিরে ফিরে।
আমি হতে চাই না তো স্থবির বিজ্ঞ -
চির নবীনের পতাকা হাতে শুনব সবার গান।
এস এস সবে করি আহ্বান;
         নিয়ে এস মধুর সুঘ্রান , নিয়ে এস অশেষ প্রাণ। 


শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

প্রেমদিন চলে গেলে

প্রেমদিন যদিও চলে যায়
  ভালবাসা রয়ে যায় পৃথিবীতে ;
শয়নে স্বপনে অর্ধজাগরণে আমাদের
প্রেম কিন্তু জেগে রয় সদা।

সিমলা বেরিয়ে ফেরার পথে ট্রেনে
এক সহযাত্রীর সাথে আলাপ হলো বেশ।
সৈনিক তিনি থাকেন দিল্লীতে ,
নামার আগে এক বাঙালী পূর্বতন
সহকর্মীর হাতঘড়ির  দিয়ে গেলেন আমাকে দায়িত্ব।
রণ প্রয়াত সে সৈনিকের ঘড়ি ,
নতুন ছিল কেনা বিয়ের ঠিক পরে-
আমাকে তার ঠিকানায়
পৌঁছে দেবার জন্য টিক টিক সারাক্ষণ।

অনেক খোঁজের পরে কলকাতায়
পেয়ে গেলাম তাদের ঠিকানা।
আপনজনের সাথে দেখা-
ভালবাসার আপনজন।
মমতা নিয়ে দুজোড়া সজল আঁখি,
কৃতজ্ঞতা ভরা মুখের উষ্ণ বুলি ,
দেয়ালে টানানো ছবির প্রভাব -
দেখে নিলাম সব।  ঘরে মা আর বিধবা।

জেগে আছে তবু যেন ভালবাসা
ঘড়ি পেয়ে জাগে ব্যর্থ আশা ?
প্রেমের বস্তু আর বস্তুর প্রেম এক হতে পারে কভু ?
প্রেমের চিহ্ন বাস্তবে নেই কে কয় ?
জাগতিক দ্রব্যে মমতার চিহ্ন দেখে নিলাম আমি।
একাধারে মায়ের এবং বধূর -
একে বেদনা বলতে নারাজ আমার মন।

বহুরূপে আছে ছেয়ে অরূপ সে যে প্রেম
  কত কত অপরূপ প্রকাশনায় এই রূপলোকে।



বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

বদ্ধকাল প্রতীক

কত দূর থেকে তারা আসছে-
    ক্লান্ত পায়ে পায়ে এগিয়ে।
অসংখ্য অবয়ব চারপাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।
সময়ের টুকরো টুকরো মূর্তি !
নিকষ অন্ধকারে মূর্তিমান আঁধারের মত নিরবিচ্ছিন্ন।
কতদিনের ক্ষোভ, উপবাস, যন্ত্রণা ;
একসাথে এসেছে নিয়ে তারা , ঘিরে এসে দাঁড়ালো।
কোনো ভাষা নেই মুখে , নেই চোখে কোনো ইশারা
মূক হয়ে আছে শুধু কালো দীঘির স্থির জল যেন।
সময়ের শত শত দূত।
আমার মর্মে মর্মে কোনো বার্তা পৌঁছে দিতে চায়
বোঝাতে পারি না বাধাটা কোথায়।
টুকরো টুকরো সময়ের মুহুর্তগুলি
একসাথে কী জানাতে চায় ?

আমার চেতনা কে ঘিরে
হাত বাড়িয়ে সেথায় চাইছে কি প্রবেশাধিকার?
বিলুপ্তপ্রায় উদ্যমের হাত ধরে,
মুক্তিকামী মানুষের মত উদগ্রীব হয়ে
অন্তরে প্রতিধ্বনি সহকারে
চেঁচিয়ে বলি 'দেব না , দেব না আমার পাসওয়ার্ড।' 


মঙ্গলবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪



কলকল স্রোতস্বিনী তীর তপোবন ।
খেচর ভূচর সহ গাহে কবিগণ ।।
গলিত রজতধারা জ্ঞান স্পর্শমণি।
ঘন অজ্ঞান তিমিরনাশী মন্ত্রধ্বনি।।
চঞ্চল নৃত্য বাদ্যগীত সুমন্দ্র মন্ত্র ।
ছন্দময় কাব্য শাস্ত্র জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ ।।
জগতে অপূর্ব তব ভাণ্ডার অনন্ত ।
ঝংকারে তব বীণা রণিত দিগন্ত ।।
টলটল সরোবর জ্ঞানী গুণী চিত্ত ।
ঠকঠক কাঁপে সদা স্মরিয়া অনিত্য ।।
ডাকিয়া ডাকিয়া ফিরে তোমারেই বারবার।
ঢাকিয়া ঢাকিয়া দাও জ্যোতিরূপে সে আঁধার ।।
তব শুভ্র আলো হতে আলোকিত সংসার।
থরথর তোমা হতে  বিড়ম্বিত  অহঙ্কার ।।
দিব্য সঙ্গীতে ভরিয়াছ এই আনন্দসাগর বসুন্ধরা ।
ধারণ করিয়াছ সকল অমোঘ শাস্ত্রবাণী মধুক্ষরা ।।
নত নত শিরে করে মুনি ঋষি বন্দনা ।
প্রণতি  করিতে রত বিদ্যার্থী যতজনা ।।
ফুলে ফুলে তব পূজা সুগন্ধিত দশদিশ ।
বরণ করিয়া গাহে কবিকণ্ঠ অহর্নিশ।।
ভারতি ! হর ভার এই মম কামনা।
মর্মে মর্মে রচ চির অমর সাধনা।।

শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সহজিয়া চর্যা

সহজিয়া সাধনার যে ধারাটি আজও আমাদের চোখের সামনে বহমান তা হলো বাউল বা উদাসী। এর মধ্যেও একাধিক উপধারা আছে যেমন আউল, দরবেশ, বাউলিয়া ইত্যাদি। গানগুলির বিশেষত্ব হলো সহজ কথায় হেঁয়ালি করে সাধনতত্ত্ব প্রকাশ। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে গানের কথা সহজ ভাষায়, কথ্য ভাষায় গায়কের একতারার সাথে, গলার সুরের সাথে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাই সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন সেই গানে উঠে আসে স্বাভাবিক ভাবেই আর সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে।  পালাগানের মত এও লোকশিক্ষার একটা উপায়।

সচরাচর আমরা দেখেছি এই ধারায় সুফীবাদ , সহজিয়া ইসলাম ও হিন্দুধর্মের প্রকাশ। কিন্তু যদি আমরা হাজার বছর পিছিয়ে এরূপ আরেকটি ধারার সন্ধান করি ?
আমাদের বঙ্গদেশে মুসলমান শাসনের অব্যবহিত পূর্বে এরূপ একটি ধারা তৈরী হয়েছিল- যা কিনা পূর্ব ভারতের উড়িষ্যা ও বিহারেও বিস্তৃত ছিল।  এই ধারাটি হলো বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা।  এই সাধনার গাথা এখন বিস্মৃত , কিন্তু রয়ে গেছে আজও তার চিহ্ন।  মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই ধারার গীতি কোষের মধ্যে আদি বাংলাভাষার রূপ খুঁজে দেখিয়ে আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন।  আজ আমাদের আনন্দের দিন , রবীন্দ্রনাথ বিরচিত জাতীয় সঙ্গীত জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করেছে বলে সংবাদ এসেছে , বাংলা ভাষার এই প্রোজ্জ্বল মুহূর্তে কেন আমরা সেই চর্যাগীতিকে স্মরণ করব না ?

বস্তুত সহজিয়া গাথার মত চর্যাপদ সাধনতত্ত্বের প্রহেলিকা প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।  আবার অবধারিত ভাবেই এতে উঠে এসেছে তত্কালীন সমাজজীবনের অভাব অভিযোগের দৈনন্দিন বার্তা।  পদকর্তারা অনেকেই উচ্চ মার্গের পন্ডিত সাধক , গুরু গম্ভীর সংস্কৃত গ্রন্থও রচনা করেছেন - কিন্তু সক্রিয় চেষ্টা হয়ত করছিলেন সহজিয়া সাধনাকে গুরত্ত্ব দেওয়ার। অনেকেই হীনযান বা মহাযান বা বজ্রযান বৌদ্ধ সাধক ছিলেন - কেউ আরাধনা করতেন দেবী প্রজ্নাপারমিতা কেউ বা মহামায়া।  শাস্ত্রী মহাশয় ৩৩ জন পদকর্তার নাম করেছেন।  পদগুলি বর্তমান বাউলগানের মতই কথাবিশিষ্ট।  কামলি পাদ লিখেছেন "সোনে ভরিতী করুণা নাবী /রূপা থই মহিকে ঠাবী /বাহতু কামলি গঅন উবেসে /গেলী জাম বহু উই কইসে /খুন্টী উপারী মেলিনি কাচ্ছি / বাহতু কামলি সদগুরু পুচ্ছি।

পদগুলির মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে সাধনার ইঙ্গিত যার বাহ্য অর্থ অন্য।  ভুসুকুপাদের একটি পরিচিত পদ উল্লেখ করা যায় " আপনা মাংসে হরিণা বৈরী / খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরি /...হরিণী বলঅ সুন হরিণা তো / এ বন ছাড়ি হোহু ভান্তো / তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দিসঅ /ভুসুকু ভণই মূঢা হিঅহি ন পইসই।  অর্থাৎ নিজের মাংসের জন্য হরিণ নিজেই নিজের শত্রু আর শিকারী ভুসুকু তাকে ক্ষণমাত্র চোখের আড়াল করে না।  হরিণী যখন হরিণকে ডেকে বন ছেড়ে পালাতে বলল , তার চপল গতিতে হরিণের চরণ আর দৃশ্যমান হলো না।  পদকর্তা জানালেন মূর্খের হৃদয়ঙ্গম হবে না এই পদের মর্ম।  এরকম আরেকটি পদ আছে "কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল / চঞ্চল চীএ পইঠো কাল। " এই পদের সঙ্গে মিল আছে লালন ফকিরের একটি দেহতত্ত্বের গানের অংশের -" আট কুঠরী নয় দরজা আঁটা / মধ্যে মধ্যে ঝলক কাটা / তার ওপরে সদর কোঠা ..". এরকম দৃষ্টান্ত অনেক দেয়া যায়।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রভূত পরিশ্রম করে চর্যাগীতি সংগ্রহ করে তার ব্যাখ্যা ও টীকা করেছেন।  পদকর্তাদের পরিচয় বের করেছেন। বাংলাভাষার চিহ্নগুলি সেখানে দেখিয়েছেন।  ভাষার দিক থেকে পদগুলি পূর্ব ভারতীয় অনেকগুলি ভাষার লক্ষ্মণ বিশিষ্ট।  এগুলিতে বাংলা ছাড়াও হিন্দী , বিদ্যাপতির ব্রজবুলি ও মৈথিলী  ও উড়িয়া ভাষার লক্ষ্মণ আছে। শাস্ত্রী মহাশয় এই ভাষার নাম দিয়েছিলেন সন্ধ্যা ভাষা।আলো আঁধারীর মত রহস্যময় ভাবার্থ , আবার বর্তমানকালে খানিক বোঝা যায় খানিক বোঝা যায় না , অতীতের বার্তাবহ কোন সঙ্কেত নির্দেশ করছে কৌতুহল জাগে তাই এই নামকরণ। পদকর্তারা অনেকেই বাঙালী নন। চলতি কথ্য ভাষায় পদগুলি রচিত সহজিয়া ধারার লক্ষ্যে।

সেইজন্যই হয়ত সহজ দোহায় এগুলি রচিত।  কাব্যসুলভ ছন্দ অলংকার আর উপমার বাহুল্য এইগুলিতে প্রায় নেই বললেই চলে - আছে লোকসাহিত্যের সুর। কিন্তু তার মধ্যেও কোথাও কোথাও দেখা যায় সুন্দর বর্ণনা -"উঁচা উঁচা পাবত তহি বসই  সবরী বালী / মোরং গী পীচ্ছ পরহিন সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী। " উচ্চ পর্বতে পর্বতে সবর বালিকার বাস , তার অলংকার হলো মোরগের পুচ্ছ আর গলায় গুন্জা ফুলের মালা। আধুনিক কবিতার মত এই বর্ণনা যথেষ্ট মনোগ্রাহী। সহজিয়া সাধনা সবর জাতীয়কেও আপন করে নিয়েছে - মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে চেয়েছে। ভাষার মধ্যে তখন বানান আর ব্যাকরণের নিগড় তৈরী হয়নি,হয়ত সেইজন্যই এত সহজে সহজিয়াদের মধ্যে স্বচ্ছন্দভাবে মিশে যাবার পথ পরিষ্কার ছিল।

সমাজ চিত্রণে তাই চর্যাগীতি এত আলোচিত।  দৈনন্দিন জীবনের অভাব অভিযোগ একটা পদে পুরোপুরি লেখা আছে " টালত মোর ঘর নাহি পড়িবেশী/হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী/বেন্গ সংসার বডহিল যাঅ /দুহিল দুধু কি বেন্টে যামাঅ। .. ইত্যাদি।  সমাজ জীবনের দর্পণ স্বরূপ চর্যাপদের আলোচনা এখন এর বেশী আবশ্যক বলে মনে হয় না।

বাউল উদাসী আর এই পদকর্তাদের মধ্যে তফাত্ হলো এই যে পদকর্তারা অপেক্ষাকৃত পণ্ডিত এবং শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন।  তাই ভাষা প্রয়োগ আর কাব্যপ্রতিভাতে এঁরা বাউল ফকিরদের থেকে উন্নত। চর্যাগীতির রচনাকালে শৃঙ্খলিত ব্যাকরণ তৈরী হয়নি তাই বানান এবং কারক বিভক্তির প্রয়োগের কোনো শৃঙ্খলা দেখা যায় না।  শুধু যেন প্রকাশ করার জন্যই গুরুশিষ্য পরম্পরায় রচনা সম্পন্ন হয়েছে - বাউলগান গুলিও তদনুরূপ। চর্যাগীতি যদিও সহজিয়া মতের প্রকাশ তবুও এর বিস্তার জনমানসে কতদূর হয়েছিল আর তা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে - পুঁথিগুলি তো গুপ্ত স্থান থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। অপরদিকে বাউলগান পুঁথিগত একদম নয় - লোকগীতিরূপে প্রচলিত , এর সংকলন বর্তমানে পুরোমাত্রায় চলছে।  বাংলাদেশে লালন আকাদেমির অবদান অনস্বীকার্য।  বাউলগান উদারপন্থী ইসলাম আর হিন্দু ভক্তিবাদের একটি মিশ্র ধারা বহন করে অপরদিকে চর্যাগীতি শুধু বৌদ্ধ ধর্মের সাধনতত্ত্ব নিয়েই রচিত - হিন্দু ধারার সংস্রব খুব বেশি দেখা যায় না।  বাউলগানের যে বহুল প্রভাব আমরা বাংলা সাহিত্যে দেখতে পাই সেরকমটি কিন্তু চর্যাপদের ক্ষেত্রে ঘটেনি , ওগুলি নেপাল আর তিব্বতের বাইরে বেরিয়ে এসে প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে অধুনালুপ্ত।

বৌদ্ধ সাধনার যে ভিন্ন ভিন্ন মত , পদকর্তারা তার প্রকাশ নিজ নিজ ভঙ্গীতে করে গেছেন চর্যাগীতিতে। এগুলি সাধনার উপদেশ , আবার বাহ্যিক কাব্য সৌন্দর্য মণ্ডিত।  গুরুশিষ্য পরম্পরায় এগুলি সংরক্ষিত হত ও সুব্যবহৃত হত। সহজিয়া সাধনার অঙ্গ হিসাবে এগুলির সাফল্যের মূল্যায়ন এবং এগুলি তত্কালীন জনমানস কতখানি আন্দোলিত করেছিল তা নিয়ে গবেষণার প্রতি কেউ উত্সাহিত হলে ভালো লাগবে।









সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৪

পাখী পড়া

গাঁজা খেকো হাঁড়িচাঁচা চোখ দুটো লাল,
লাফিয়ে লাফিয়ে ফেরে ডাল থেকে ডাল।
খ্যাঁচ খ্যাঁচ ছাতারেরা ব্যস্ত বড়ই,
চিড়িক চিড়িক ওড়ে হাল্কা চড়ুই।
বাতাসীরা ডাক দেয় এখানে ওখানে,
রোদ পড়ে আলোছায়া গেরস্ত বাগানে।
কোকিলের কুহুতান মাতায় হাওয়া,
বসন্ত এসে চলে গেল ফের -
হলো না তো গান গাওয়া।


শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪

ক্ষণিকের পথসঙ্গী

অফিস গিয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই খবর পেলুম।  মনটা ভারী হয়ে গেল।  সুভাষিনী মহাপাত্র নামে আমার জনৈকা সহকর্মিনী আগের রাতে ঢেন্কানল থেকে ফেরার পথে  দুর্ঘটনায় মারা গেছে।  দেশে বাড়ি গিয়েছিল, ভুবনেশ্বর ফেরার পথে দুর্ঘটনা।
ঘটনা দুঃখ জনক সন্দেহ নেই , চুপচাপ বসে রইলুম শুনে।  কাজকর্ম কিছুক্ষণ মাথায় উঠলো। বসে বসে কত কথা ভাবতে লাগলুম।

চার মাস আগের কথা।  বন্ধু অনাদির পিতৃবিয়োগের সংবাদ এলো। বারুনীর কৃপায় ইহলোক থেকে অকস্মাৎ তিনি অকাল মুক্তি পেয়েছেন , কাউকে সেবা- চিকিত্সার কোনো সুযোগ দেন নি।  অনাদির দেশ ঢেন্কানল।  আমার দপ্তরেই কাজ করে।  অনাদিকে সংবাদমাত্র  সে রাতে ঢেন্কানল রওনা হতে হবে , তার সাথে আসার জন্য আমাকে ফোনে দেহাতী উড়িয়া ভাষায় অনাদির মা কত কী বলেছিলেন আর এই শোক কতভাবে প্রকাশ করেছিলেন তা আজ আমার আর পুরোপুরি মনে নেই কিন্তু বিশেষ করে বলেছিলেন এই বেদনার ক্ষণে আমার সঙ্গ ও প্রবোধ অনাদির কত আবশ্যক এবং আমি যেন যাত্রাপথে তাকে একা না ছেড়ে দিই - ইত্যাদি।  অতএব আমিও অনাদির সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সৌজন্য বা বন্ধুত্ব যে খাতিরেই হোক , রাত আটটায় বসে পড়লুম বাসে।

সে কী রাস্তা ! শহর ছাড়াতেই চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল।  রাস্তার দু ধারে মাঠ।  ঢেন্কানল যতই এগিয়ে আসে ততই অন্ধকার বাড়ে। আলোর কোনো বিন্দু চোখে পড়ে না , দু হাত দূর অবধি ঠিকঠাক ঠাহর হয় না। কেউ মেরে আধমরা করে ফেলে রেখে গেলে ও টের পাবার উপায় নেই।  মাঝে মাঝে আবার জঙ্গল।  রাস্তা আর শেষ হয় না , গাড়ি চলছে তো চলছেই।  গাড়ির মধ্যে গ্রামবাসী চাষা , চাকুরে , ছেলে বুড়ো  মিস্ত্রী মজুর রয়েছে।  একটি স্ত্রীলোক আর তার কোলের বাচ্ছা পাল্লা দিয়ে জানলার বাইরে বমি করতে করতে চলল।  অন্ধকার রাস্তায় ডাকাত বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে আমি চললাম , বাকীরা দেখলাম বেশ নিশ্চিন্ত।

সব কষ্টের ই শেষ আছে।  রাত দুটোয় বাস থেকে নামলাম ঢেন্কানল।  অনাদির বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল।  বাড়ি পৌছলাম।মাসীমা আপ্লুত হয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরে কত কী বলতে লাগলেন কিছুই বুঝলাম না।  বাড়িতে লোক সমাগম কম হয় নি।

শবযাত্রায় আতসবাজীর সদ্ব্যবহার করতে করতে আর মাঝে মাঝে হরিনামে চারদিক চমকে দিয়ে আমরা এগুতে লাগলাম। ভোর রাতে বাজির আওয়াজে আশে পাশের গাছের হনুমানগুলো ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে ডালে ডালে দুপদাপ  লাফালাফি লাগালো।  অদূরে শ্মশান পৌছে গেলাম।  গেটের দুপাশে দুটো বড় শিমুল গাছ অভ্যর্থনা করছে।  আমরা সেখানে প্রবেশ করলাম।

দাহ করার সময়টা বসে বসে সেদিন কত কথা ভাবছিলাম মনে নেই, একটা ডাক শুনে চাইলাম সেদিক।  একটি মেয়ে ডাকছে। ' আমি আপনার অফিসএ কাজ করি , এরা আমাদের গ্রামের পুরনো লোক , তাই এসেছি। ' আমি হাসলাম।  মেয়েটা পাশে বসলো।  ' আপনি বুঝি প্রথম এলেন এখানে ?' আমি মাথা নাড়লাম। আরো নানা কথা হতে লাগলো , সব আমার মনে নেই।

বছর ছয়েক আগে এক প্রিয়জনের মৃত্যুতে শ্মশান যাত্রী হয়েছিলাম।  কলকাতার নিমতলা শ্মশানে কতঘন্টা অপেক্ষা করার পর আমাদের পালা এলো - তিন চার ঘন্টা হবে।  প্রচুর মৃতদেহ আর তাদের অনুগামী শত শত নানাবিধ লোক , ডোম , পূজা , অন্তিম সংস্কার, মন্ত্রপাঠ নিয়ে সেখানে এক মহা হট্টগোলের ব্যাপার।  জায়গা কম , অনেক পরলোকগত বা পরলোকগতা খাটিয়া আরোহণ করে এবং প্রিয়জনদের স্কন্ধে আরোহণ করে রাস্তার ওপরেই প্রতীক্ষা করছিলেন।  এর মধ্যে কিছু চীন জাপান দেশীয় মঙ্গোল চেহারার পর্যটক হট্টগোল দেখে চলে এসেছে  ক্যামেরা নিয়ে ব্যাপার দেখতে।  ঢুকে তারা তো থ।  আমি তামাশা করে তাদের দিকে চেয়ে বেশ মজা পেয়েছিলাম।  সেই গল্প মেয়েটিকে বললাম। মেয়েটির কাছ থেকে শুনলাম এই গ্রামের শ্মশানের মাহাত্ম্যের কথা। কিভাবে হিমালয় থেকে খুব বড় তান্ত্রিক এসে দুশো বছরের পুরনো এই শ্মশানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন , তাঁর কেমন অদ্ভূত বিভূতি ক্ষমতা ছিল ইত্যাদি।  এখানে অন্তিম সংস্কার হলে স্বর্গলাভ একেবারে নিশ্চিত- জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা অবধি শতমুখে স্বীকার করেন।  আমি চিন্তা করেছিলাম স্বর্গলাভের এমন এমন সুপথ থাকতে  লোকে এমন অধম স্থানে এত কষ্ট স্বীকার করে কেনই বা বাস করে আর জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা তিনটি মূর্তি ঘিরে এমন উন্মাদনা আর প্রবীণ  বয়স পর্যন্ত মেয়েলি পুতুলখেলা কেন যে চালিয়ে যায় সেই রহস্যের কথা।

পরদিন সেই মেয়েটির সাথেই সকালে বাসে করে ভুবনেশ্বর ফিরেছিলাম। পথে একসাথে দোকানে খেলাম।  এই করে আলাপ জমল।  এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে একসাথে অফিস এ খাওয়া দাওয়া , একসাথে বাসা ফেরা চলল।  দুবার সিনেমা দেখলাম তার সাথে আর একবার গেলুম নন্দন কানন।
তারপর সে অফ্ফিসের কাজেই কদিন অন্যত্র চলে গেল আর যোগাযোগ ছিল না।  দশ বারো দিন হলো ফিরেছে সুভাষিনী , এখনো দেখা হয়নি।  এই সংবাদ পাওয়া গেল।

ভরাক্রান্ত হৃদয়ে ভাবছিলাম ঢেন্কানল যাবার সেই ভয়াবহ রাস্তাটার কথা, দুর্ঘটনা আর বিচিত্র কি ?   

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৪

কৈশোর ও চাঁদের পাহাড়

এমন বাঙালী কমই আছেন যিনি অন্তত একবার ছোটবেলায় চাঁদের পাহাড় বইটা পড়েন নি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত পরিচিত রচনা এই চাঁদের পাহাড়। তাই যখন সেই বই সিনেমা হয়ে পর্দায় উঠে আসে তখন তো একটা হৈচৈ পড়বেই। বাংলা চলচ্চিত্রে যে তথাকথিত জোয়ার এসেছে বলে রব শুনছি তাতে আরো নিশ্চয় আতিশয্য বাড়বে বই কি। সিনেমা তে animation আর প্রযুক্তির ব্যবহার করে জিনিষটা ভালো করে দেখানোর প্রচেষ্টা প্রসংশনীয়।  পরিশ্রম আর ব্যয়াধিক্য দৃশ্যে দৃশ্যে প্রকট। মূল বই এর সাথে সঙ্গতি রেখে বানানো হয়েছে যথাসম্ভব।  কিন্তু বিষয়বস্তু রচয়িতার থেকে স্বতন্ত্র হয়ে গেছে - বিষয়বস্তু বুঝতে গেলে বুঝতে হবে বিভূতিভূষণ কে। আমি এখানে চলচ্চিত্র সমালোচনা আরম্ভ করব না , আমি চিনতে  চেষ্টা করব পথের পাঁচালী র কবিকে - চাঁদের পাহাড়ের দিকে মুখ করে।

প্রতিটি মানুষের মনে যে চিরকিশোর জেগে রয় চাঁদের পাহাড় গল্পে সেই কিশোর প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। গল্পের শঙ্কর পল্লীগ্রামের অখ্যাত সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ। চাকরীর উমেদারী করতে সে চিঠি পাঠালো সুদূর আফ্রিকা। ছেলেবেলা থেকে তাকে অজানা জগৎ হাতছানি দিয়ে ডাকে, মন চায় রবিনসন ক্রুসোর মত দুঃসাহসী হতে আর বিদেশের  অভিযান কাহিনী -কিশোর কাহিনী পড়ে পড়ে মনে জন্মায় দুরন্ত কৈশোরের স্পৃহা।  এই কৈশোর ধরা আছে চাঁদের পাহাড় গল্পে -  সেই কিশোর জেগে থাকে তরুণের অন্তরে , তাই পাট কলের বাবুগিরি উপেক্ষা করে তরুণ পাড়ি জমালো আফ্রিকা। কৈশোরের সেই স্বপ্ন, যার জন্য মন্দিরে প্রার্থনা , সেই স্বপ্ন সার্থক করার মধ্যে যে পুলক তার মধ্যে জেগেছিল - সেই কৈশোরের পুলক তার তরুণ হৃদয়কে মাতিয়ে দেয় - এই গল্প সেই কৈশোরের।
পরিণত বয়সে যেদিন শ্রীকান্ত নিজের অগোছালো জীবনের স্মৃতিচারণ করতে কলম নিয়ে বসল সেদিন সে স্বীকার করলো বারবার তার স্মৃতিতে কিশোর বেলার সাথী ইন্দ্রনাথের উজ্জ্বল আবির্ভাব। সেই সব দিনগুলোর কথা শ্রীকান্ত ভুলতে পারে নি - সারা জীবন ইন্দ্রনাথের মত আরেকটা মহাপ্রাণ সে খুঁজেছে কিন্তু পায় নি। ঐরকম হবার চেষ্টা শ্রীকান্ত করেছিল- মুগ্ধ করেছিল তাকে  ইন্দ্রনাথের সাহস, একা রাতে শ্মশানে দক্ষ নৌকা চালানো -সাপখেলা শিখতে যাওয়া, করাল নিশায় মাছ চুরি এ সমস্ত রোমহর্ষক ঘটনা।  জীবনের সেই সম্পদ শ্রীকান্ত বুকে ধরে রেখে দিয়েছিল আর অভিমান করে বলেছিল তাকে না জানিয়ে কেন ইন্দ্রনাথ সহসা একদিন অন্তর্ধান করলো। এখানেও সেই সুদূরের আহ্বান।
এই আহ্বানের কোনো অভিসন্ধি নেই। শুধুমাত্র অজানাকে জানার আগ্রহ থেকেই কাজে ইস্তফা দিয়ে শঙ্কর বেরিয়ে পড়েছিল আলভারেজের সাথে। গল্পের শেষে লেখা আছে সে আবার চাঁদের পাহাড় যেতে চায়। ঠিক এই কারণেই তোপসে বারবার ফেলুদার সাথে রহস্যের সন্ধানে বেরোয় , সন্তু সঙ্গী হয় কাকাবাবুর ইস্কুল কলেজ আর পড়াশোনা ভুলে গিয়ে। অন্ধকার রাতে মন্ত্রমুগ্ধর মত শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথের  কথায় নির্জন বিপদসঙ্কুল গঙ্গাবক্ষে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য ছিল জেলেদের নৌকা থেকে মাছ চুরি। কিন্তু সেই চুরির কারণ নিছক দুষ্টুমি নয়, অন্নদাদির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো। এই নিঃস্বার্থ ছেলেমানুষী সিনেমাতে দেখানো হয়নি। শঙ্কর খনির লোভে আলভারেজের সাথে বেরোয় নি , বেড়িয়েছিল কাছ থেকে বিপদকে দেখতে। হীরে পেয়ে গেল , কিন্তু তার নির্লোভ চিত্ত তাতে আসক্ত হয় নি , হীরে নিয়ে এসেছিল একইরকম ভাবে গাঁয়ের লোকের সাহায্যের জন্য - নিজের ভাগ্য ফেরাতে চেষ্টা সে করে নি। সেইজন্যই আফ্রিকার অভিশাপ বুনিপ তাকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল, আফ্রিকার বলি শঙ্করকে হতে হয়নি। বারবার শঙ্কর বিপদের মুখ থেকে ফিরে এসেছে , এক যেন মহত্তর কোনো কর্মের উদ্দেশ্যে তাকে রক্ষা করা হয়েছে।  ঠিক যেমন কালরাত্রির দ্রংষ্ট্রা সেই রাত্রে ইন্দ্রনাথদের ক্ষুদ্র তরীকে গ্রাস করেনি , নদীবক্ষে তলিয়ে তারা যায়নি , সর্পাঘাত পাশ কাটিয়ে চলে গেছে আর জেলেরা নাগাল পায়নি।
এই ছেলেমানুষী সিনেমাতে দেখানো হয়নি। সিনেমাতে শঙ্কর যেন রবিনসন ক্রুসো , পাঠক বালক নয়। সে পরিণত দেহী যুবক , তোপসে নয় ফেলুদা। কিম্বা আবার যখের ধনের বিমল। এইখানেই তফাৎ রয়ে গেছে। সেই কৈশোরকে এখানে তুলে ধরা হয়নি। গল্পে শঙ্কর অন্যরকম।
গল্পের শঙ্কর নিজেকে জড়িয়ে নেয় আলভারেজ, আত্তিলিও গাত্তি র জীবনের সাথে। আলভারেজের প্রতি অসীম মমতায় তার মন উথলে ওঠে - আগ্নেয়গিরির নাম দিয়ে দেয় মাউন্ট আলভারেজ। একই রকম মনোভাব দেখতে পাই আমরা ফেলুদার প্রতি তোপসে আর অবশ্যই ইন্দ্রনাথের প্রতি শ্রীকান্তর। ইন্দ্রনাথের এক কথায় শ্রীকান্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।  প্রতিটি ভাগ্যবান কিশোর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে এমন ই একজন খুঁজে পায় , যার সাথে জীবন জড়িয়ে দেয়া যায়। সেই জন্যই কিশোর সাহিত্যে রবিনসন ক্রুসোর ন্যায় চরিত্রগুলি সৃষ্টি হয়ে চলেছে। রবিন হুড কিংবদন্তী হয়ে আছে সেই কোন ঐতিহাসিক কাল থেকে। নাহলে চাহিদা মেটাবে কে ?
যেখানে কৈশোরের দুরন্তপনা সেখানেই বাত্সল্য। প্রতিবন্ধী কাকাবাবু সন্তুকে উদ্ধার করতে পিছপা হন না একবারও।  অন্নদাদির কথা নতুন করে কি বলব।  চাঁদের পাহাড় গল্পে ভাগ্যান্বেষী লড়াকু কঠিন হৃদয় পর্তুগীজ কিভাবে যেন স্নেহ করতে শুরু করে শঙ্করকে , আগলে রাখে সমস্ত বিপদ থেকে।  এই স্নেহবাত্সল্য যেন কৈশোরের এই গল্পের ঋদ্ধি।  শঙ্কর ও শুধুমাত্র দলপতি হিসাবে নয় কখন যেন তাকে পিতৃ জ্ঞানে আপন ভাবতে শুরু করে - এও সেই কৈশোরের লক্ষ্মণ।
এই কৈশোর আর বাত্সল্য কোথায় খুঁজে পেলেন বিভূতিভূষণ ? অবশ্যই তাঁর নিজের জীবনে। মানুষটার মধ্যে এক কিশোর চিরজাগরুক ছিল। খুব বেশি বয়স অবধি তাঁকে কঞ্চি হাতে বেড়াতে দেখা যেত ঠিক পথের পাঁচালীর অপুর মত। অপুর মধ্যে সেই কিশোর আজও উঁকি মারে। সর্বজয়া , ইন্দির ঠাকরুন আর দূর্গার বাত্সল্য তাকে পালন করে। এই বাত্সল্যই কি কারো কারো মনে কৈশোরকে বাঁচিয়ে রাখে ? তারা কী এই কারণেই চিরকিশোর থেকে যায় ? ইছামতীর তীরে কন্চি হাতে কল্পনায় ভেসে অপুর আড়ালে বিভূতিভূষণ যে ছেলেখেলায় মেতে যেতেন , তার ই কি পূর্ণতর অভিব্যক্তি চাঁদের পাহাড় ?
কে জানে ? অপুর কল্পণার সীমাবদ্ধতা পার করেই  কী শঙ্করের স্বপ্ন পূর্তির অভিযান  বলে মনে হয় ? প্রকৃতি তপস্বী আত্মমগ্ন আধ্যাত্মিক মানুষটা কিভাবে আবার চিরকিশোর হতে পারে?
বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন বিভূতিভূষণ।  করেছেন ছেলেদের গৃহশিক্ষকতা। সকলেই দেখেছে তাঁর বাত্সল্য।  ছেলেদের গল্প করে করে পড়াতেন। বলতেন অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের কথা , আফ্রিকার কথা , কোমাডো দ্বীপের ড্রাগনের কথা।  চেনাতেন রাতের আকাশ। ছেলেদের সাথে সমবয়সী হয়ে মিশতেন , মিতে হয়ে যেতেন। প্রচুর ভ্রমণকাহিনী , অভিযান কাহিনী পড়তেন পিপাসু হয়ে।  তাঁর সেই জীবনপর্বের গল্পগুলির একটি হলো চাঁদের পাহাড় - বাকীগুলির মধ্যে আছে হীরে মানিক জ্বলে বা মরণের ডঙ্কা বাজে।  এভাবেই কৈশোর তাঁর জীবনে বাঙ্ময় ছিল। একদিকে স্নেহাশয় শিক্ষক অপরদিকে নিজেই এক বালক আবার তার সঙ্গে পরিণত মনস্ক মগ্ন  সাহিত্যিক মানুষ - একাধারে তিনি সবই হয়ে উঠেছিলেন। সাধারণ মানুষ তিনি ছিলেন না , শঙ্কর বাঙালীর ছেলে হয়ে চাকরি ছেড়ে আলভারেজের সাথে চলল পৃথিবীর রূপ দেখতে - এ কথা সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে না। যে উপলব্ধিগুলি  বারবার তিনি লিখেছেন সেগুলি সহজ হয়েও যেন অধরা থেকে যায়। চরম সত্য প্রকাশ করেন যখন হীরে মানিক জ্বলে উপন্যাসে লোভে পড়ে প্রাণবলি হয়। আত্তিলিও গাত্তি নামে যে দুঃসাহসী নাবিক যুবকের মৃতদেহ শঙ্কর আবিষ্কার করলো সে সব পেয়েও সব হারিয়ে মারা গেছে। হীরের খনির খোঁজে সে বেরিয়েছিল , পেয়ে গিয়ে নিজেকে মালিক মনে করলো কিন্তু সঙ্গীদের চক্রান্তে নিহত হলো। রত্নভান্ডার তার কপালে জোটেনি। ঐ নামের একজন বাস্তবে অভিযাত্রী ছিলেন আফ্রিকায়। তিনি অভিযানের প্রচুর বই আর ফটো প্রকাশ করেছিলেন চাঁদের পাহাড় প্রকাশের কিছুদিন আগে।সম্ভবত বিভূতিভূষণ গল্পের উপকরণ হিসাবে ওঁর বইগুলি ব্যবহার করেছেন। সেই নামটাই বিভূতিভূষণ  ব্যবহার কেন করেছেন ? শঙ্কর গল্পের গাত্তির জুতো  থেকে হীরে পেয়েছিল, শঙ্করের আড়ালে লেখক নিজে উপকরণ স্বরূপ অভিজ্ঞতার বহুমূল্য রত্ন সংগ্রহ করার ঋণ স্বীকার করলেন আর অভিযাত্রীকে সম্মান জানালেন কি না কে জানে !  অসাধারণ ভাবে রচয়িতা দেখিয়েছেন শঙ্কর পথ চিনে নেবার, ফিরে আসবার চিহ্ন হিসাবে যে নুড়ি গুলো কুড়িয়ে নিয়েছিল না বুঝে -সেগুলিই হীরে। শেষে শঙ্কর হীরের খনির সন্ধান গোপন করে গেল সংবাদপত্রের দপ্তরে , লোভের বোঝা আর সে বাড়াতে চায়নি। বিভূতিভূষণ যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছেন শঙ্করের মধ্যেই। তাই তিনি অসাধারণ মানব , তাঁর রচনা নেহাৎ একটা ছেলেভুলানো গল্প নয়। লেখকের অসামান্য অনুভূতি প্রকাশ পেয়ে যায়।  বিভূতিভূষণের জীবন ঘাঁটলে এই অসাধারণত্ব বারবার প্রকাশ হয়। তবুও অদ্ভুতভাবে এতকিছুর মধ্যেও  সেই কিশোর বারবার দেখা  দেয়  কখনো অপু কখনো শঙ্কর কখনো আর কেউ হয়ে।  কিশোর সাহিত্যের তো অভাব নেই , কিন্তু এই ব্যাপারটা বিভূতিভূষনের ক্ষেত্রে এইখানে আলাদা। আরণ্যকের সত্যচরণ দেখার আগ্রহে বালকের মত বেরিয়ে পড়ে কিন্তু দিনলিপির বর্ণনা একজন পরিণত মনস্বীর। কখনো আত্মভোলা পথিক , কখনো সরল কিশোর , কখনো শিক্ষক  আবার কখনো  প্রকৃতি তপস্বী হয়ে বিভূতিভূষণ আমাদের মাঝে ধরা দেন - রচয়িতার পরিচয় আমরা পেয়ে যাই , মানুষটা বেঁচে থাকে আমাদের মধ্যে - চিরকিশোর  আজও ঘেঁটু সোঁদালীর  গন্ধ মেখে চোখ মেলে থাকে।  তার দুই চোখ অনবরত সুর্য্যের আলোয় নতুন রঙের খোঁজ করে, চাঁদের পাহাড়ের মত হাজার হাজার গল্প তার জন্য তৈরী হবে তবু তার আশ মিটবে না।

রবিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৪

মন বাজারী

চেয়ে দেখো চারিদিকে আজ বসেছে রঙীন মেলা
ইস্তাহারের রঙে রঙ্গে ছেয়ে গেছে -
            পুরনো ধূসর বালুকাবেলা।
চোখ ধাঁধানো ঝলমলে আলোয় সাজানো সব দোকান,
মাল্টিপ্লেক্স আর তার পাশে পাশে রসনা তৃপ্তির রেস্টুরেন্ট।
প্রাণ হারিয়ে কোথা থেকে ফের ফিরে পেয়েছে সকলে যেন প্রাণ।
 ভ্রান্ত গর্বে গলা ফাটিয়ে দোকানীরা ঘোষণা করছে নিরন্তর
অভ্রান্ত নিজেদের মালের গুণগত মান।
ব্যাঙ্ক আর ইন্সুরেন্স কোম্পানির  মাইনে করা বিক্রেতারা
প্রাণপণ চেষ্টা করে বোঝাচ্ছে সবচেয়ে লাভজনক তাদের স্কিমটাই ।
তাদের সঙ্গে জুটেছে শেয়ার বাজারের দালাল।
লাভ ক্ষতির হিসাবে হিসাবে পটু হয়ে গেছে মাথা
বোধহয় হয়ে গেছে মগজ ধোলাই।
আলো আঁধারি তে দিবারাত্র লাভ ক্ষতির অঙ্ক কষছে -
অন্য কাজের সময় কই ?  অন্য ব্যাগার  কাজে মস্তিস্ক  দিচ্ছে জবাব।
অধ্যাপক মার্কামারা  কয়েকজন বলাবলি করছে
   'পয়সা তো দালালী তে। '

মনটা তো বাজারের পানে ,
কোনখানে আছে সবচেয়ে লাভজনক
স্বপ্নময় উপকরণ।
পঞ্চেন্দ্রিয় খুঁজে বেড়ায় তৃপ্তির উপকরণ -
বাজারীরা খোঁজে আকর্ষণী উদাহরণ।
অরাজক বাজারে বড় ছোট মাঝারি
হয়ে গেছে সকলের মনগুলো বাজারী।